শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, গবেষণা ও উন্নয়নের দীপ্ত পদচারণায় ৩৪ বছরে পদার্পণ করল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের শহরাঞ্চল থেকে শুরু করে প্রান্তিক ও অজপাড়াগাঁয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার আলোয় আলোকিত করে আসছে এই বিদ্যাপীঠ। আজ ২১ অক্টোবর অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপিত হচ্ছে। দীর্ঘ এই গৌরবময় পথচলার মাইলফলক উদ্যাপনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সংকট, সম্ভাবনা এবং আগামীর প্রত্যাশা নিয়ে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীদের ভাবনা জানাচ্ছেন সাব্বির হাসান নিরব–
পুরোনো পাঠে নতুন পৃথিবীর সন্ধান
– উম্মে সালমা, শিক্ষার্থী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
প্রযুক্তির উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবর্তন আমাদের জীবনযাত্রাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে প্রতিদিন পরিবর্তন হচ্ছে পৃথিবী। কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের পড়াশোনার পদ্ধতি কতটা তাল মেলাতে পারছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো পরীক্ষার ফলাফল, নম্বর অর্জন ও মুখস্থবিদ্যার ওপর অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ বাস্তব জীবনে শুধু বইয়ের তথ্য মনে রাখাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, সৃজনশীল চিন্তা, যোগাযোগের সক্ষমতা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার। একজন শিক্ষার্থী ভালো ফলাফল করেও যদি বাস্তব পরিস্থিতিতে নিজের জ্ঞান কাজে লাগাতে না পারেন, তবে সেই শিক্ষার উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হলো তা ভাবার সময় এসেছে। শ্রেণিকক্ষে আলোচনা, ব্যবহারিক কাজ, গবেষণা, দলগত অনুশীলন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
মধ্যবিত্তের ভরসাস্থল হোক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
– সুমনা আক্তার, শিক্ষার্থী, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ
সন্তানের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারকে হিসাব করে চলতে হয়। একদিকে সংসারের ক্রমবর্ধমান খরচ, অন্যদিকে পড়াশোনার ব্যয় সবকিছু সামলে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা তাদের জন্য সহজ নয়। এই কঠিন বাস্তবতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে পারে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের স্বপ্ন পূরণের অন্যতম নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। তুলনামূলক কম খরচে পড়া যায় বলে মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এটাই প্রধান ভরসা। তবে শুধু ভর্তির সুযোগ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সময়মতো পরীক্ষা নেওয়া ও ফল প্রকাশ, পর্যাপ্ত শিক্ষক, ভালো পাঠাগার এবং ব্যবহারিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের খরচ চালাতেও কাজ করেন। তাই তাঁদের জন্য বৃত্তি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো দরকার। এখান থেকে ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষার্থীরা যেন সমসাময়িক যুগের উপযোগী যোগ্যতা, দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারেন, সেটিই নিশ্চিত করতে হবে।
মফস্বলে উচ্চশিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে যে বিদ্যাপীঠ
– মো. মাজহারুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া
দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য একসময় শহরমুখী হতে হতো। কিন্তু অর্থ ও নানা সীমাবদ্ধতায় অনেকের কাছে সেটি ছিল শুধুই একটি স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রান্তিক অঞ্চলের কলেজগুলোকে অধিভুক্ত করায় মফস্বলে ছড়িয়ে পড়ছে উচ্চশিক্ষার আলো। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কলেজগুলোতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়ার সুযোগ থাকায় বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থী ও মেয়েদের জন্য এ সুযোগ একটি আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। বাড়ির কাছে পড়ার সুযোগ থাকায় শিক্ষার্থীরা পরিবার ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত থেকেই নিজেদের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিতে পারছেন। মফস্বলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বিস্তার শুধু ডিগ্রি দেওয়ার ব্যবস্থা নয়, বরং এটি উচ্চশিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার্থীর আরও কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
সেশনজট নিরসন ও খাতা মূল্যায়নে আধুনিকায়ন
– মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন, শিক্ষার্থী, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার বিস্তারে মাইলফলক হলেও দীর্ঘদিনের সেশনজট শিক্ষার্থীদের প্রধান উদ্বেগ। চার বছরের স্নাতক কোর্স শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগায় গ্র্যাজুয়েটরা চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়েন, বাড়ে হতাশা ও পরিবারের আর্থিক চাপ। এই জটের নেপথ্যে রয়েছে পরীক্ষা গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, কেন্দ্রীয়ভাবে খাতা মূল্যায়ন এবং ফল প্রকাশে অস্বাভাবিক বিলম্ব। উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডারের কঠোর বাস্তবায়ন। আঞ্চলিক মূল্যায়ন কেন্দ্র স্থাপন ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে খাতা দেখা চালু হলে ফল ত্রিশ দিনের মধ্যে প্রকাশ করা সম্ভব। প্রতিটি কলেজে বিষয়ভিত্তিক পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ও নিয়মিত ক্লাস মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। সিলেবাসে তত্ত্বের পাশাপাশি বাধ্যতামূলক ইংরেজি, তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা দক্ষতা যুক্ত করলে সনদনির্ভর শিক্ষা কর্মমুখী ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
উচ্চশিক্ষা বিস্তারে যুগোপযোগী পাঠ্যক্রমের দাবি
– নাদিরা জাহান প্রীতি, শিক্ষার্থী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ
একটি জাতির জ্ঞান, দক্ষতা ও উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো উচ্চশিক্ষা। উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীই জ্ঞান ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিতে পারে। উচ্চশিক্ষার প্রসারকে আরও কার্যকর করতে শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান ও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম প্রণয়নও এখন সময়ের দাবি। শুধু সনাতনী ধারায় আটকে না থেকে বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে আধুনিক কারিকুলাম অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করাই হোক প্রতিষ্ঠানটির আগামী দিনের প্রধান লক্ষ্য।
আগামীর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যেমন চাই
– তানজিলা আক্তার তানু, শিক্ষার্থী, পল্লবী মহিলা ডিগ্রী কলেজ।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম বিশাল এবং প্রধান ভিত্তি। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের আস্থার এই জায়গাকে আমরা আগামীতে এমন এক স্থানে দেখতে চাই যেখানে শিক্ষার মান হবে বিশ্বমানের, শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থাকবে উন্মুক্ত। আমরা চাই, প্রতিটি শিক্ষার্থী যেন নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পান। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদ অর্জনের প্রতিষ্ঠান না হয়ে জ্ঞান, যুক্তি, সৃজনশীলতা এবং নেতৃত্ব বিকাশের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠুক। অনিয়ম, প্রশাসনিক হয়রানি বা যেকোনো অভিযোগ সরাসরি কর্তৃপক্ষকে জানানোর জন্য একটি গোপনীয় ও দ্রুত কার্যকর অনলাইন পোর্টাল থাকা প্রয়োজন। আমাদের প্রত্যাশা একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক, গবেষণামুখী, শিক্ষার্থীবান্ধব ও কর্মসংস্থানমুখী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
ডিএ/
