জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংকট ও অধিকার আদায়ের নির্ভরতার নাম শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. শাহরিয়ার হোসেন। তিনি শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে আর্থিক সহায়তা, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সমস্যা ও শিক্ষার্থীদের নানা প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষার ১৫তম মেধাস্থান অর্জন করে আজহারুল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থী। কিন্তু ভর্তির টাকার অভাবে এই মেধাবী তরুণের উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির স্বপ্ন ধূসর হতে যাচ্ছিল। এসময় তার পাশে দাঁড়ান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. শাহরিয়ার হোসেন। আজহারুলের ভর্তির সব দায়িত্ব নেন তিনি।
শুধু আজহারুলই নয়, উচ্চ শিক্ষার স্বপ্ন ভঙ্গ হতে চলা বহু শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ান এই ছাত্রদল নেতা। এরমধ্যে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের সিয়াম শেখের ভর্তির ব্যয় কিংবা ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. রাব্বির ভর্তি ফরম পূরণে সহযোগিতা করেন শাহরিয়ার।
শুধু এটাই নয়, যখনই কোনো শিক্ষার্থী সমস্যার মুখে পড়েন, স্মরণ করেন মানবিক ছাত্রনেতা শাহরিয়ারকে। এরমধ্যে ব্যবসায়িক প্রতারণায় পড়ে মূলধন হারানোর মুখে পড়েন বিশ্ববিদ্যালটির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইমদাদুল হক। ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার তার পাশে দাঁড়ান। তার ছোট্ট ব্যবসায় মূলধন যোগানে সার্বিক সহযোগিতা করেন৷ বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জনপ্রিয় মুখ হয়ে উঠেছেন ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার।
শাহরিয়ারের জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে রয়েছে আরও গল্প। তার উদ্যোগে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ডাস্টবিন সংস্কার ও মেরামত, ভাষাশহীদ রফিক ভবনে বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার স্থাপন এবং বিবিএ ভবনের লিফটের নষ্ট ফ্যানের পরিবর্তে নতুন ফ্যান সংযোগ স্থাপনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কর্মচারী ও ক্যান্টিন স্টাফদের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। এ ছাড়া ক্যাম্পাস বন্ধ থাকাকালে অভুক্ত কুকুরের খাবারের ব্যবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় গেটের পাশে পানের দোকান চালানো পিতৃহীন শিশু সাদ্দামের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথা জানেন পুরো ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা।
শাহরিয়ারের এসব উদ্যোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছোটন খান বলেন, “ভর্তি জটিলতা থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসের পানির সংকট—বিভিন্ন বিষয়ে প্রশাসনের কাছে বলেও অনেক সময় দ্রুত সমাধান পাওয়া যায় না। শাহরিয়ার ভাই শিক্ষার্থীদের এসব সমস্যায় ব্যক্তিগতভাবে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন।”
শিক্ষার্থী আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘শাহরিয়ার ভাই তার পাশে না দাঁড়ালে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন তার পূরণ হতো না। এজন্য আমি শাহরিয়ার ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ। ভাইয়ের ভবিষ্যত সফলতা কামনা করি।’
ছাত্র রাজনীতিতে আসার গল্প: ২০০৭ সালে আরশীনগর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শাহরিয়ারের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের শুরু। এরপর তিনি ইউনিয়ন ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রত্যক্ষ ভোটে ১৮৭ ভোটের মধ্যে ১৫৯ ভোট পেয়ে ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ (সিআর) নির্বাচিত হন। ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে সে সময় তিনি ছাত্রলীগের হাতে গুরুতর মারধরে শিকার হন।নির্যাতন ও ত্যাগের জন্য তিনি ২০২২ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ২০২৪ সালে ৩নং যুগ্ম আহবায়ক হিসেবে কমিটিতে স্থান পান।
গণতন্ত্র পুনরুত্থানের জন্য কারাবরণ: ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের দিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভে অংশ নেন ও পুলিশি বর্বর হামলার শিকার হন তিনি। ২০১৩ সালে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচীতে বাবুবাজারের পুলিশের নির্যাতনের শিকার হন। ২০১৯ সালে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে থেকে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। ২০২১ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭ অক্টোবর নবীন শিক্ষার্থীদের ফুল দিতে এসে ফ্যাসিষ্ট ছাত্রলীগের হাতে নির্মম হামলার শিকার হন। ২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশেও পুলিশের হামলায় তিনি আহত হন।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সামনের সারিতে: ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন শাহরিয়ার। ৮ ও ১০ জুলাইয়ের ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি।। ১১ জুলাই পুলিশের চারটি ব্যারিকেড ভেঙে শিক্ষার্থীদের বিশাল মিছিল নিয়ে শাহবাগে পৌঁছান তিনি। ১৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি প্রদান এবং ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় ছাত্রলীগের নারকীয় হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন।
আহত অবস্থাতেই ১৬ জুলাই ঢাবি হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ, ১৯ জুলাই কাকরাইলে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন এবং ২০ জুলাই কারফিউ ভেঙে মিছিল করেন। ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে সর্বপ্রথম মিছিল নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন শাহরিয়ার। ৫ আগস্ট গণভবনের ফটকে প্রবেশকারী প্রথম ২০ জনের একজন ছিলেন শাহরিয়ার।
নতুন বাংলাদেশে রাজনীতি: ৫ আগস্টের পর নতুন বাংলাদেশে ক্যাম্পাসে জাতীয়তাবাদী ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন সামাজিক ও গঠনমূলক কাজের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের অধিকার বাস্তবায়নে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘লং মার্চ টু যমুনা’ আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। দুটি ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার সামনে অবস্থান নেওয়ার সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুলিশের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন।
সর্বশেষ, চলতি বছরের ৩ আগস্ট ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের অস্থিতিশীলতা ও গোপন রাজনীতির অপতৎপরতার বিরুদ্ধে জোরালো সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করেন।
ছাত্ররাজনীতির জন্য ছেড়েছেন সুইডেনের উচ্চ শিক্ষার সুযোগ: রাজনীতির পাশাপাশি পড়াশোনা ও গবেষণায়ও যুক্ত রয়েছেন শাহরিয়ার হোসেন। ২০০৮ সালে চরকুমারীয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাসের পর ২০১০ সালে ঢাকা কলেজে থেকে এইচএসসি পাশ করেন তিনি। পরে ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ভর্তি পরীক্ষায় সমাজবিজ্ঞান অনুষদে ২৬২তম হন। ২০১৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
২০২০ সালে সুইডেনের স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলেন শাহরিয়ার। তবে দলের দুর্দিনের সময় ছাত্ররাজনীতির জন্য সে সুযোগ ছেড়ে দেন তিনি। বর্তমানে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমফিল করছেন শাহরিয়ার। “ওমেন এক্সসেস টু ইনফরমেশন ইন বাংলাদেশ : এ স্টাডি ওন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার” নিয়ে গবেষণার জন্য সম্প্রতি গবেষণা অনুদান ও বৃত্তি পেয়ে পড়ালেখা করছেন।
ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক মো. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘দুঃসময়ে দলের জন্য নিঃস্বার্থে নিজের অবদান রেখেছি এবং ভবিষ্যতে এই ধারা দলের প্রতিটি ক্ষেত্রে অব্যাহত থাকবে। আমি মনে করি, শিক্ষার্থীদের সমস্যা হলে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো একজন ছাত্রনেতার দায়িত্ব। রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে শিক্ষার্থীদের অধিকার ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে চাই।’
