শিরোনাম:
Network News BD
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

নগরায়ণের চাপে ঢাকা: যানজট, দূষণ ও পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের সম্ভাবনা

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি

প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ৪:১২ PM ২৫ বার পঠিত
নগরায়ণের চাপে ঢাকা: যানজট, দূষণ ও পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের সম্ভাবনা

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি সম্পাদিত

হাফিজুর রহমান:

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এই শহরে আসছেন। কর্মসংস্থান, উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার প্রত্যাশায় ঢাকামুখী মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু এই ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ সামাল দেওয়ার মতো অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা গড়ে ওঠেনি সমানতালে। ফলে ঢাকা আজ অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অসহনীয় যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা ও আবাসন সংকটের মতো বহুমুখী সমস্যার মুখোমুখি।

‎‎নগরায়ণ একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ উন্নয়নের পরিবর্তে জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি তারই একটি বাস্তব উদাহরণ।
‎
‎যানজট: প্রতিদিনের সময় ও কর্মঘণ্টার অপচয়
‎ঢাকার অন্যতম বড় সমস্যা যানজট। রাজধানীর প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সকাল ও সন্ধ্যায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রোগীসহ সব শ্রেণির মানুষকে প্রতিদিন এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক সময় কয়েক কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় হয়। এতে শুধু মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে না, বরং কর্মঘণ্টা কমে যাচ্ছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় বাড়ছে এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

‎বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের Toward Great Dhaka প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় প্রায় ৭ কিলোমিটারে নেমে এসেছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যানজটের কারণে প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছিল। এটি পুরোনো সময়ের পরিসংখ্যান হলেও ঢাকার যানজট সমস্যার অর্থনৈতিক প্রভাব বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ।

যানজটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। অপরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা, ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং গণপরিবহনের সমন্বয়হীনতা এর অন্যতম। পাশাপাশি একই এলাকায় অধিকাংশ সরকারি-বেসরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীভূত হওয়ায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষকে নির্দিষ্ট কিছু সড়ক ব্যবহার করতে হয়।

মেট্রোরেল চালুর ফলে যাতায়াতব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে একটি মেট্রোরেল প্রকল্প দিয়েই পুরো নগরের যানজট নিরসন সম্ভব নয়। মেট্রোরেলের সঙ্গে বাস, রেল, নৌপরিবহন ও অন্যান্য গণপরিবহনের কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও সময়নিষ্ঠ গণপরিবহন গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

বায়ুদূষণ ও পরিবেশগত বিপর্যয়

‎ঢাকার আরেকটি ভয়াবহ সমস্যা বায়ুদূষণ। প্রতিদিন নগরবাসীকে ধুলাবালি, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটার নির্গমন এবং শিল্পকারখানার দূষিত বাতাসের মধ্যে চলাচল করতে হচ্ছে। বিশেষ করে শীতকালে বায়ুদূষণের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এর প্রভাব শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের ওপর বেশি পড়ে।

‎সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ সংস্থা IQAir-এর ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় বার্ষিক গড় PM2.5-এর মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৬৮ মাইক্রোগ্রাম। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্দেশিত মান মাত্র ৫ মাইক্রোগ্রাম। অর্থাৎ ঢাকার বাতাসে সূক্ষ্ম বস্তুকণার ঘনত্ব নিরাপদ নির্দেশিত মাত্রার তুলনায় প্রায় ১৩.৬ গুণ বেশি।

বায়ুদূষণের পাশাপাশি ঢাকার জলাশয় ও খালগুলোও অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে। অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, জলাশয় ভরাট, অপরিশোধিত বর্জ্য এবং শিল্পকারখানার দূষিত পানি নদী ও খালে মিশে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ বাসিন্দা পাইপযুক্ত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় রয়েছেন। অন্যদিকে অপরিশোধিত পয়োবর্জ্যের ৮০ শতাংশের বেশি ঢাকার জলপথে গিয়ে পড়ছে। অর্ধেকের বেশি খাল ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে অথবা বর্জ্যে আটকে রয়েছে।

জলাবদ্ধতাও এই অপরিকল্পিত নগরায়ণের অন্যতম পরিণতি। সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। একসময় ঢাকার খাল, জলাভূমি ও নিম্নাঞ্চল বৃষ্টির পানি ধারণ করে প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থাকে সচল রাখত। কিন্তু এসব জায়গা ভরাট করে আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হয়েছে। ফলে নগরবাসীকে বর্ষা মৌসুমে নিয়মিত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

‎অপরিকল্পিত নগরায়ণ: সমস্যার মূল কোথায়?

‎ঢাকার বর্তমান সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ হলো অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের চাহিদা বাড়লেও সে অনুযায়ী নাগরিক অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, সরু রাস্তার পাশে বহুতল ভবন এবং অপর্যাপ্ত পার্কিংয়ের কারণে নগরের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে ঢাকার প্রায় ৬৯ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে। জলাভূমি হারানোর সঙ্গে নগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিরও সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

‎এ ছাড়া রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়নও ঢাকার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। দেশের অধিকাংশ বড় সরকারি দপ্তর, গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে মানুষ বাধ্য হয়েই জীবনের প্রয়োজন মেটাতে রাজধানীমুখী হচ্ছে। অথচ দেশের অন্যান্য শহরে সমানভাবে কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা গেলে ঢাকার ওপর এই অতিরিক্ত চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের সম্ভাবনা ও করণীয়

‎ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করা অসম্ভব নয়। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়।

প্রথমত, ঢাকার পরিবহনব্যবস্থাকে আধুনিক ও সমন্বিত করতে হবে। মেট্রোরেলের পাশাপাশি উন্নত বাসসেবা, নির্দিষ্ট বাসস্টপ, নিরাপদ ফুটপাত, সাইকেল চলাচলের উপযোগী পথ এবং কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থী, নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য গণপরিবহনকে আরও নিরাপদ ও সহজলভ্য করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নির্মাণকাজে ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ, যানবাহনের নির্গমন পরীক্ষা, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং শিল্পকারখানায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত গাছ লাগানো এবং বিদ্যমান পার্ক ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ করতে হবে।

তৃতীয়ত, ঢাকার খাল, নদী, জলাশয় ও নিম্নাঞ্চল রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দখল হয়ে যাওয়া খাল পুনরুদ্ধার, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কোনোভাবেই জলাশয় ভরাট করে অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প অনুমোদন করা উচিত নয়।

চতুর্থত, ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। দেশের বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। এতে মানুষ নিজ নিজ এলাকায় থেকেই উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি ঢাকার আশপাশের নগর ও উপশহরগুলোকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে।

‎সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), দুই সিটি করপোরেশন, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ওয়াসা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা। শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন করলেই হবে না, তার যথাযথ বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকিও প্রয়োজন।

ঢাকা শুধু একটি শহর নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সম্ভাবনার অন্যতম কেন্দ্র। কিন্তু একটি শহরের উন্নয়ন শুধু উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন একজন নাগরিক নিরাপদে চলাচল করতে পারবেন, বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারবেন, নির্বিঘ্নে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা পাবেন এবং স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারবেন।

আমাদের মনে রাখতে হবে, নগরায়ণ বন্ধ করা সমাধান নয়; বরং নগরায়ণকে পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও জনবান্ধব করে তোলাই সময়ের দাবি। ঢাকা যেন মানুষের বসবাসের অনুপযোগী একটি কংক্রিটের শহরে পরিণত না হয়, সে দায়িত্ব সরকার, নগর পরিকল্পনাবিদ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক—সবার। আজই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এর আরও বড় মূল্য দিতে হবে।

আমরা এমন একটি ঢাকা চাই, যেখানে উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে নাগরিক স্বস্তি, পরিবেশের ভারসাম্য এবং মানুষের জীবনমান।
‎
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ

বিষয়বস্তু:

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!