আয়েশা সিদ্দিকা:
সোনালি বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই রংপুরের বাতাসে যেন বদলে যায় অনুভূতি। ভোরের ঘাসে জমে থাকা শিশির, খোলা মাঠের ওপর ভেসে থাকা হালকা কুয়াশা আর রাতের বাতাসে শীতল পরশ—সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতি জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। ঋতুর সন্ধিক্ষণে রংপুরের গ্রামগঞ্জে শুরু হয়েছে শীতকে বরণ করার প্রস্তুতি। যদিও দিনের বেলায় রোদের তেজ এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, তবু ভোর ও সন্ধ্যার আবহে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ঋতুবদলের ছাপ।
বাংলার উত্তরাঞ্চলের জনপদ রংপুরে শীতের আগমন বরাবরই আলাদা তাৎপর্য বহন করে। আবহাওয়া অফিসের তথ্যানুযায়ী, রংপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চলগুলোতে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ (বর্তমান সময়) থেকেই রাতে তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে এবং ভোরে হালকা কুয়াশা ও শিশির পড়ার মধ্য দিয়ে শীতের আগমনী বার্তা স্পষ্ট হচ্ছে।
গ্রামীণ জনপদে সকাল শুরু হয় নানা পরিচিত দৃশ্যের মধ্য দিয়ে। মিঠাপুকুর, পীরগঞ্জ, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ কিংবা গঙ্গাচড়ার গ্রামগুলোতে ঋতুবদলের এই আবহ প্রকৃতির সৌন্দর্যে যোগ করে নতুন মাত্রা। তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পাড়ে ভোরের বাতাসে শীতলতার অনুভূতি যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। রংপুরে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক গভীর। হেমন্তের এই সময়ে কৃষকের চোখ থাকে মাঠের ফসলের দিকে। কোথাও আমন ধান কাটার প্রস্তুতি, কোথাও ধান ঘরে তোলার ব্যস্ততা। আবার অন্যদিকে শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেক কৃষক।
ঋতুবদলের প্রভাব পড়তে শুরু করে রংপুরের শহর ও হাটবাজারেও। শীতের পোশাক, চাদর, কম্বল ও গরম কাপড়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মানুষের মধ্যে শুরু হয় ভাবনা। কেউ পুরোনো শীতবস্ত্র পরিষ্কার করে প্রস্তুত রাখছেন, কেউবা সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন পোশাক কেনার পরিকল্পনা করছেন। ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন শীতবস্ত্রের জোগান দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শীতের প্রস্তুতি সব সময় সহজ নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের সঙ্গে বাড়তি শীতবস্ত্রের খরচ যোগ হলে অনেক পরিবারকে হিসাব করে চলতে হয়। বিশেষ করে যাঁরা দিনমজুরি, কৃষিশ্রম কিংবা অনানুষ্ঠানিক পেশার ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের কাছে শীতের আগমন কখনো কখনো বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রংপুরে শীত মানেই শুধু কুয়াশা, পিঠাপুলি আর রোদপোহানোর আনন্দ নয়। শীতের তীব্রতা বাড়লে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন ছিন্নমূল মানুষ, দরিদ্র পরিবারের শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি এবং খোলা জায়গায় বসবাসকারী মানুষ। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র ও উষ্ণ আশ্রয়ের অভাবে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন হয়ে ওঠে কঠিন। তাই শীতে ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ করলে জনদুর্ভোগ অনেকটা কমানো সম্ভব।
শীতের শুরুতেই সচেতন থাকা প্রয়োজন স্বাস্থ্য নিয়েও। তাপমাত্রার পরিবর্তনে শিশু ও প্রবীণদের বাড়তি যত্ন নিতে হবে। ঘন কুয়াশায় সড়কে দৃশ্যমানতা কমে গেলে যানবাহন চালানোর সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের মাধ্যমে শীতকালীন ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়।
রংপুরে শীতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ সংস্কৃতি ও খাদ্যঐতিহ্যের নিবিড় সম্পর্ক। শীতের আমেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক বাড়িতে শুরু হয় পিঠাপুলি তৈরির পরিকল্পনা। চালের গুঁড়া, নারকেল, গুড় আর দুধের সমন্বয়ে তৈরি নানা পিঠা বাঙালির শীতকালীন আনন্দকে পূর্ণতা দেয়। এই পিঠাপুলি বাঙালির ঐতিহ্য বহন করে। এই ঐতিহ্য শুধু খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পারিবারিক বন্ধন, গ্রামীণ জীবনযাপন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত সাংস্কৃতিক স্মৃতি।
এ ছাড়া ঋতু পরিবর্তনের সময় রংপুরের মানুষের জন্য প্রয়োজন আবহাওয়ার পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা। শীতের আগমন কৃষি, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা দ্রুত কমে গেলে কৃষকের ফসল রক্ষা, দরিদ্র মানুষের শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
হেমন্তের এই শেষভাগে দাঁড়িয়ে রংপুর এখন যেন অপেক্ষা করছে শীতের পূর্ণ আগমনের। ভোরের শিশির, মাঠের স্নিগ্ধতা, কৃষকের নতুন ফসলের স্বপ্ন আর গ্রামীণ জীবনের চেনা ব্যস্ততা—সবকিছু মিলিয়ে প্রকৃতি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। ঋতুর সন্ধিক্ষণে রংপুরের আকাশ-বাতাসে যে শীতের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তা কেবল আবহাওয়ার পরিবর্তনের বার্তা নয়; এটি প্রকৃতির নতুন সাজ, কৃষকের নতুন প্রত্যাশা এবং মানবিকতার পরীক্ষারও সময়। শীত আসুক আপন সৌন্দর্যে, আর তার উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ুক রংপুরের প্রতিটি মানুষের জীবনে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা শঠিবাড়ি এলাকায় কৃষক জসিম মিয়া বলেন,”শীতের সময় আলু ও বিভিন্ন শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি নিই। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন ভালো হয়। তবে বীজ, সার ও সেচের খরচ বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ ওঠানো নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয়।” তিনি আরো বলেন, ” উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম যেন পাই, তাহলে পরিবারের খরচ মিটিয়ে কিছুটা লাভের মুখ দেখতে পারব।”
রংপুর সদর এলাকায় এলাকার একজন বস্ত্র ব্যবসায়ি আলিম মিয়া। তিনি বলেন,”শীতের আমেজ বাড়লে সোয়েটার, জ্যাকেট, চাদর ও কম্বলের চাহিদা বাড়তে শুরু করে। তবে ক্রেতাদের অনেকেই কম দামের পোশাক খোঁজেন। তাই সবার সাধ্যের মধ্যে শীতবস্ত্র রাখতে চেষ্টা করি।”
রংপুরের স্থায়ী বাসিন্দা ও বাদাম বিক্রেতা রহিম মিয়া বলেন, “আমাদের প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। শীত বাড়লে গরম কাপড়ের প্রয়োজন হয়, কিন্তু সবার জন্য নতুন কাপড় কেনা সম্ভব হয় না। শীত বেশি পড়ার আগেই কম্বল বা গরম কাপড় পেলে অনেক উপকার হতো।”তিনি আরো বলেন,”শীত বাড়লে আয়ও কমে যায়।এই সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালনো অনেক কষ্টকর হয়।”
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মারুফ ইয়াসমিন মিরা বলেন,”শীতকাল এলেই পিঠাপুলির প্রতি আলাদা একটা আকর্ষণ অনুভব করি। ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা আর খেজুরের গুড়ের মিষ্টি স্বাদ শীতের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়। পড়াশোনার ব্যস্ততার মাঝেও বন্ধুদের সঙ্গে পিঠা খাওয়া ও আড্ডা দেওয়ার মুহূর্তগুলো খুব উপভোগ করি।” তিনি আরও বলেন, “আমার কাছে শীত মানেই কুয়াশামাখা সকাল, পিঠার ঘ্রাণ আর আনন্দে কাটানো কিছু সুন্দর সময়।”
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী মনিরা মিম বলেন, “রংপুরে শীতের আগমন মানেই এক অন্যরকম মায়াবী অনুভূতি। ভোরের কুয়াশায় ঢেকে যাওয়া পথঘাট, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির আর হিমেল বাতাস যেন প্রকৃতিকে নতুন করে সাজিয়ে তোলে। শীতের সকালে এক কাপ গরম চা আর নরম রোদে বসে থাকার আনন্দই আলাদা। এই শীত আসুক উষ্ণতা, শান্তি আর একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে।”
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
