শিরোনাম:
Network News BD
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

বিশ্ববাজারে আবারও রাজত্ব করতে পারবে মসলিন?

রুশাইদ আহমেদ

রুশাইদ আহমেদ

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ৭:৫৫ PM ৩১ বার পঠিত
বিশ্ববাজারে আবারও রাজত্ব করতে পারবে মসলিন?

ছবি: বাসস

একসময় বিশ্বজুড়ে আভিজাত্যের প্রতীক ছিল বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন পোশাক। অতি সূক্ষ্ম বুনন, হালকা ও স্বচ্ছ গড়ন, আর নান্দনিক সব নকশার কারণে এই মূল্যবান বস্ত্র আদিকালের রোমান, গ্রিক ও আরব সাম্রাজ্য থেকে থেকে শুরু করে ভারতের মুঘল দরবার পর্যন্ত সমাদৃত হত মৌলিক সৌখিনতার অনুষঙ্গ হিসেবে।

কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের জাল বিস্তৃত হওয়ার পর বাজারে বিলেতি ম্যানচেস্টার মিলের যন্ত্রে তৈরি সস্তা কাপড়ের একচেটিয়া আধিপত্য, দেশীয় পোশাক উৎপাদনের ওপর শাস্তিমূলক কর নির্ধারণ এবং দেশীয় তাঁতশিল্পীদের ওপর শাসকগোষ্ঠীর অকথ্য দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের ফলে বাংলাদেশের মসলিন শিল্প কালের গর্ভে হারিয়ে যায়।

পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেঘনা নদীর অববাহিকা অঞ্চল থেকে মসলিন উৎপাদনের বিশেষ কাঁচামাল ঐতিহ্যবাহী ‘ফুটি কার্পাস তুলা’-ও বিলুপ্ত হয়ে যায় প্রকৃতি থেকে। ফলস্বরূপ, ১৮৫০ সালের লন্ডন মহাপ্রদশর্নীর পর বিশ্বমঞ্চে আর দেখা মেলেনি মসলিন বস্ত্রের।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মসলিন পোশাক বুননের ধাপগুলোও খুব একটা সহজ ছিল না। মাঠ থেকে তুলা সংগ্রহের পর আঁশ ছাড়িয়ে বোয়াল মাছের চোয়ালের হাড় দিয়ে তা পরিষ্কার করা হতো। এরপর অতি সূক্ষ্ম চরকায় মাপ মতো সুতা কেটে ধুয়ে অনন্য সব নকশার মসলিন তৈরি করা হতো।

স্থানীয় আবহাওয়া আর লোকজ বিজ্ঞানও সম্পৃক্ত ছিল গোটা প্রক্রিয়ার সঙ্গে। সন্ধ্যার পর থেকে সূর্যোদয়ের আগপর্যন্ত আর্দ্র আবহাওয়ায় মসলিন বুননের কাজ করতে হতো তাঁতিদের। কেননা, ফুটি কার্পাসের অত্যন্ত মিহি তুলা শুষ্ক বাতাসে উবে যেত সহজেই। ফলে উৎপাদন ব্যয় হ্রাসে এবং তুলা অপচয় রোধে রাতের বেলা মসলিন বয়নের কাজ করতেন কারিগররা। শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়কে সেসময়কার স্থানীয় তাঁতিরা মনে করতেন অনন্য আশীর্বাদ। স্থানটিতে সুতা কাটার জন্য সন্ধ্যার পর থেকেই স্বাভাবিক তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বজায় থাকত বলেই ছিল এত কদর! কিন্তু সেই শীতলক্ষ্যা নদীও এখন পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বদলে যাওয়ায় আগের মতো মসলিন তৈরির পরিবেশ সেখানে আর নেই।

এতদসত্ত্বেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঐতিহাসিক নথি, তুলার নমুনা ও জিনোম গবেষণার সহায়তায় বাংলাদেশে মসলিনের কাঁচামাল পুনরুদ্ধারে কাজ শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের অধীনে শুরু হওয়া এই পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় বর্তমানে মসলিনের বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তারই অংশ হিসেবে ২০২০ সালে ঢাকাই মসলিন ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ৫০০ গজ মসলিন কাপড়ের একটি অর্ডারও সরবরাহ করা হয়েছে। পাশাপাশি, মসলিন উৎপাদনে তিন শতাধিক প্রান্তিক নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যা গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাকে আরও সচল করবে বলে মত অর্থনীতিবিদদের। এছাড়া, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ফুটি কার্পাসের চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞানীরা কাপাসিয়া, গাজীপুর, বাঘাবাড়ি, রাজশাহী থেকে ৩৯টি বন্য তুলার জাত সংগ্রহ করেছেন। লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত দেশের আদি প্রজাতির মসলিনের সুতার জিনোমের সাথে সংগ্রহ করার তুলার সিকোয়েন্সিং করা হচ্ছে। সেখান থেকে শতভাগ জিনোম ম্যাচ করানোর পর উদ্ভূত বৃক্ষ থেকে ‘ফুটি কার্পাস’ তুলা আবাদ করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ৫০টি প্রাচীন মসলিন তৈরির বিশেষ যন্ত্রও পুনরায় প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।

সাধারণ সুতির পোশাকের কাউন্ট ৪০-৮০ হলেও, মসলিন থেকে উৎপাদিত সুতার কাউন্ট ৭৩১-৭৫০ মেট্রিক কাউন্টের ওপরে। এর ফলে বস্ত্রটি শিশিরের মতো স্বচ্ছতা ধারণ করে।

তবে, একটি মসলিন শাড়ি উৎপাদনে এখনও বেশ কয়েক মাস সময়ের দরকার পড়ছে। এতে উৎপাদন খরচ হচ্ছে আকাশচুম্বী। এরপরও প্রথম পর্যায়ের উৎপাদন শেষে সরকার বর্তমানে দ্বিতীয় পর্যায়ের উৎপাদন কার্যক্রমের ওপর জোর দিচ্ছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পে বিনিয়োগের অঙ্ক সাড়ে ১৮ কোটি টাকা বলে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

প্রাথমিকভাবে, একটি মসলিন বস্ত্র উৎপাদনে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ হলেও, গবেষকরা আধুনিক প্রযুক্তি ও কলাকৌশলের সহায়তায় সেটিকে ১ থেকে ৩ লাখ টাকায় নামিয়ে আনতে কাজ করছেন। এক্ষেত্রে মসলিনের জিনোম সিকোয়েন্সিং করা ফুটি কার্পাস ও অন্যান্য কাঁচামাল ব্যাপক হারে উৎপাদন করা গেলে ব্যয় কমে আসবে বলে মত অর্থনীতিবিদদের। এর সঙ্গে সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবো এলাকায় অবস্থিত ‘ঢাকাই মসলিন হাউজ’ এর মাধ্যমে মসলিন পুনরুৎপাদনের কারিগরি কার্যক্রমের সম্প্রসারণ বেসরকারি পর্যায়ে উন্নীত করতে কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি কাঁচামালের চাহিদা মেটাতে কাপাসিয়া, কুমিল্লা ও রাজশাহীর গ্রামীণ চাষিদের দিয়ে চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদের পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও ভাবছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক সাইফুদ্দিন খালেদ বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে কার্যকর ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে মসলিনকে বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আসবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজনের সুযোগ বাড়বে। আমার বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে ঢাকাই মসলিন আবারও বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের গৌরবের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।”

একইসঙ্গে, মসলিনের “হারানো গৌরব” ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি শিল্পটিকে একটি টেকসই ও অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় খাতে রূপান্তরিত করতে সংশ্লিষ্টদের কাজ করার পরামর্শও দেন খালেদ। উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং কাঁচামালের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে কারিগরদের দক্ষতার উন্নয়ন ঘটিয়ে তাঁদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিতের মাধ্যমে মসলিন শিল্প “দেশের অর্থনীতির এক অভূতপূর্ব নিয়ামকশক্তি”-তে পরিণত হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ঐতিহ্যবাহী সূক্ষ্ম বুননশিল্পের নান্দনিকতা ও উচ্চ চাহিদার বাজারমূল্যকে পুঁজি করে ঢাকাই মসলিন আবারও বিশ্ববাজারে নিজের হারানো গৌরব ফিরে পাবে কি-না, তা নির্ভর করছে পণ্যের মান অক্ষুণ্ণ রাখা, উৎপাদন বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারে কার্যকর বিপণন কৌশল গ্রহণের ওপর। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতটা সফল হবে, এখন সেটাই দেখার পালা।

লেখক: রুশাইদ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

বিষয়বস্তু:

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!