কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের ব্যয় সামাল দিতে খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট।
এর অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬০ হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট কর্মীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই প্রস্তাবের আওতায় আসতে পারেন।
গতকাল সোমবার মাইক্রোসফটের এক মুখপাত্র এ তথ্য জানিয়েছেন।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারত ও যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাচিত কিছু বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদমর্যাদা পর্যন্ত ও এর নিচের পর্যায়ের কর্মীরা এ প্রস্তাবের আওতায় আসবেন। তবে ডেটা সেন্টার, বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের কিছু কর্মীসহ নির্দিষ্ট কয়েকটি দলের সদস্যরা এ সুবিধা পাবেন না।
কর্মীদের কাছে পাঠানো এক স্মারকে মাইক্রোসফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা অ্যামি কোলম্যান বলেন, ‘স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার এই প্রস্তাব কর্মীদের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে কর্মীদের জন্য আরও নমনীয়তা তৈরি করা হচ্ছে এবং সম্ভব হলে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাড়ানো হচ্ছে।’
চলতি বছর কর্মীদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার সুযোগ দিয়ে এটি মাইক্রোসফটের দ্বিতীয় উদ্যোগ।
এর আগে গত এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রে তাদের প্রায় ৭ শতাংশ কর্মীকে আগাম অবসরে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।
সিএনবিসির তথ্য অনুযায়ী, ওই কর্মসূচির আওতায় আসার যোগ্য কর্মীদের প্রায় ৩০ শতাংশ স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেছিলেন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থায় জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, গত জুনের শেষে মাইক্রোসফটের বিশ্বজুড়ে কর্মীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার। ২০২৫ সালের শেষ দিকে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ২৮ হাজার।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রস্তাবের আওতায় আসার যোগ্য কর্মীর সংখ্যা মোট কর্মীর প্রায় ২৭ শতাংশ।
চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে মাইক্রোসফটের ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের কথা রয়েছে।
বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে, তখন এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
প্রযুক্তি খাতের অভ্যন্তরীণ বিশেষজ্ঞরাও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দারিও আমোদেই সতর্ক করে বলেছেন, এআইয়ের প্রভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারাতে পারেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের একাধিক বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেটফ্লিক্স তাদের মোট কর্মীর প্রায় ৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় এক হাজার কর্মী ছাঁটাই করার পরিকল্পনা করছে।
অনলাইন নিলাম ও বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম ইবে চলতি মাসের শুরুতে এক হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে। এর আগে চলতি বছরের আরেক দফা ছাঁটাইয়ে প্রতিষ্ঠানটির ৮০০ কর্মী চাকরি হারিয়েছিলেন।
গত মে মাসে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা তাদের বৈশ্বিক কর্মীসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ ছাঁটাই করে। এতে প্রায় আট হাজার কর্মী চাকরি হারান।
এপ্রিলে মেটা আরও জানায়, তারা নতুন করে ছয় হাজার কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা বাতিল করেছে। পাশাপাশি, তাদের আরও সাত হাজার কর্মীকে এআইনির্ভর কাজের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন দায়িত্বে স্থানান্তর করা হবে।
যাত্রী পরিবহনসেবা প্রতিষ্ঠান উবার গত সেপ্টেম্বরে প্রায় ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দেয়। এতে আনুমানিক তিন হাজার বা তারও বেশি কর্মী চাকরি হারাতে পারেন।
অন্যদিকে, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান অ্যামাজন চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিশ্বজুড়ে ১৬ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছিল।
এর আগে গত জুলাইয়ে মাইক্রোসফট প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী ছাঁটাই করে। ওই ছাঁটাইয়ের বড় অংশই ছিল প্রতিষ্ঠানটির এক্সবক্স গেমিং বিভাগের কর্মী।
এআই অবকাঠামোয় ৭০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পথে চার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান
এআই খাতে ব্যয় বৃদ্ধির চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বিশ্বের শীর্ষ চার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, অ্যালফাবেট ও মেটার বিনিয়োগ পরিকল্পনায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর এই চার প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে এআই ডেটা সেন্টার, চিপ ও কম্পিউটিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রায় ৭০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে যাচ্ছে।
মাইক্রোসফট জানিয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে প্রতিষ্ঠানটির মোট ব্যয় ছিল ৪১ বিলিয়ন ডলার। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যয় বেড়ে ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে তখন পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল।
তবে চলতি ২০২৬ সালের পুরো বছরের জন্য মূলধনী ব্যয়ের পূর্বাভাস কমিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আগে যেখানে ব্যয় ১৯০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল, এখন তা কমিয়ে ১৭৫ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
মাইক্রোসফটের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) অ্যামি হুড বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক আলোচনায় জানান, প্রতিষ্ঠানটির মোট ব্যয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ব্যয় হচ্ছে ‘স্বল্পমেয়াদি সম্পদ’ কেনার পেছনে, বিশেষ করে কম্পিউটার চিপ সংগ্রহে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এআই ও প্রচলিত— উভয় ধরনের কম্পিউটিং অবকাঠামোর জন্য গ্রাহকদের চাহিদা থাকায় এ খাতে ব্যয় বাড়ছে।
