উম্মে হাবিবা শান্তা:
বিশ্ব অর্থনীতির গতি যে আজও জ্বালানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তা নতুন করে মনে করিয়ে দিল সৌদি আরবের ইয়ানবু পাইপলাইনে সাম্প্রতিক হামলা। হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা তখনো থামেনি, এর মধ্যেই ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বন্ধ হয়ে গেল সৌদির পূর্ব থেকে পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন লাইন। এই ঘটনা শুধু সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয় নয়। এটি বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহের ঝুঁকি সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির গলার নালি
হরমুজ প্রণালি ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত একটি সরু জলপথ। উত্তরে ইরান আর দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সবচেয়ে সরু জায়গায় এর প্রস্থ মাত্র ঊনচল্লিশ কিলোমিটার। এই ছোট্ট পথ দিয়েই প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি দশ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে যায়। বিশ্বের মোট তেল চাহিদার এক পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক তৃতীয়াংশের দায়িত্ব এই প্রণালির কাঁধে।
সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল রপ্তানির প্রধান এবং প্রায় একমাত্র নিরাপদ পথ এটি। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তাও অনেকাংশে এই পথের ওপর নির্ভরশীল। সরু হওয়ার কারণে এবং চারপাশে পাহাড়ি এলাকা থাকায় সামরিকভাবে একে বন্ধ করে দেওয়া তুলনামূলক সহজ। এ কারণেই অর্থনীতিবিদেরা একে বিশ্ব অর্থনীতির গলার নালি বলে থাকেন।
গত কয়েক বছর ধরে এই গলার নালি ঘিরে টানাপোড়েন বাড়ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বৈরিতা, ইসরায়েল ও ইরানের প্রক্সি লড়াই, ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক অভিযান এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ মিলে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ইরান একাধিকবার বলেছে, প্রয়োজনে তারা হরমুজ বন্ধ করে দেবে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা উপসাগরে নৌ টহল বাড়িয়েছে। এই উত্তেজনার মধ্যেই হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেন থেকে সৌদির তেল স্থাপনায় নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিকল্প পথের সন্ধান ও নতুন ঝুঁকি
হরমুজের ঝুঁকি কমাতে সৌদি আরব বিকল্প পথের কথা ভাবছিল বহুদিন ধরেই। তার ফল হিসেবে তৈরি হয়েছে ইস্ট ওয়েস্ট পাইপলাইন। বারো শ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন সৌদির পূর্ব উপকূল থেকে তেল নিয়ে যায় পশ্চিমের লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত ইয়ানবু বন্দরে। দৈনিক প্রায় পঞ্চাশ লাখ ব্যারেল তেল এই পথে রপ্তানি হয়। হরমুজ বন্ধ হয়ে গেলে এই পাইপলাইনই হবে সৌদির প্রধান ভরসা। সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই কারণে ফুজাইরা বন্দর পর্যন্ত পাইপলাইন তৈরি করেছে।
কিন্তু বিকল্প পথও যে নিরাপদ নয়, তা প্রমাণ হলো গত ২৬ ফেব্রুয়ারির হামলায়। হুতি বিদ্রোহীরা ইয়ানবু শিল্পনগরী লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এতে পাইপলাইনের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সাময়িকভাবে তেল পরিবহন বন্ধ করে দিতে হয় সৌদি কর্তৃপক্ষকে। আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষকেরা বলছেন, হুতি ও ইরান যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এই পাইপলাইনকে টার্গেট করে, তাহলে সৌদির হাতে হরমুজের বাইরে আর কোনো বড় রপ্তানি পথ থাকবে না।
জ্বালানি রাজনীতি ও তেলের দাম
এই হামলার পেছনে শুধু ইয়েমেন যুদ্ধের প্রতিশোধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতি। ওপেক প্লাসের নেতৃত্বে সৌদি আরব বাজারে তেলের দাম বাড়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে ইউরোপ রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে তারা এখন মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল। চাহিদা বাড়া এবং সরবরাহ কমার এই দ্বৈত চাপে তেলের দাম বাড়ছে। আর বাড়তি দামের কারণেই তেল স্থাপনাগুলো এখন সবচেয়ে বড় টার্গেটে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ও করণীয়
এই অস্থিরতার প্রভাব সরাসরি এসে পড়বে বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর। বাংলাদেশ তার চাহিদার প্রায় পুরো জ্বালানি তেলই বাইরে থেকে কেনে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম দশ ডলার বাড়লে আমাদের বার্ষিক আমদানি ব্যয় প্রায় এক শ কোটি ডলার বেড়ে যায়। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়ে। কৃষিতে সেচ ও সার পরিবহনের খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ে বাজারের প্রতিটি নিত্যপণ্যের দামে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ে এবং টাকার মান কমতে থাকে।
এই বাস্তবতায় বসে থাকার সুযোগ নেই। জ্বালানি নিরাপত্তাকে এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। শুধু তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি খাতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। কয়লা, পারমাণবিক শক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে শিল্প ও পরিবহন খাতে জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পুরোনো প্রযুক্তির মেশিন বদলে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি আনা এখন সময়ের দাবি।
কৌশলগত তেল মজুত বাড়ানো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম থাকার সময় বেশি করে কিনে মজুত রাখলে ভবিষ্যতের সংকটের সময় চাপ অনেকটা সামাল দেওয়া যাবে। পাশাপাশি তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি করতে হবে। এতে দাম ও সরবরাহ দুটোই নিশ্চিত থাকবে।
হরমুজ প্রণালি শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়। এটি বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা। হরমুজের পর সৌদির পাইপলাইনে হামলা প্রমাণ করেছে, বিকল্প পথও এখন নিরাপদ নয়। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, উৎপাদন কমানো এবং বাড়তি চাহিদার কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা আগামী দিনেও থাকবে। বিশ্ব যখন নতুন জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশেরও সেই পথে হাঁটতে হবে। নবায়নযোগ্য শক্তি, জ্বালানি সাশ্রয় ও কৌশলগত পরিকল্পনা ছাড়া প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংকটের ধাক্কা আমাদের অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেবে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল এই অস্থির বিশ্বে আমরা স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে যেতে পারব।
