শিলা খাতুন:
বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিজেই নানা সমালোচনা ও প্রশ্নের মুখে রয়েছে। রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারি কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করার জন্যই এই প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দুদক কতটা স্বাধীনভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে, সেই প্রশ্ন আজও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত দুর্নীতি দমন ব্যুরো রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেনি। এর ফলে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবার বিশ্বে দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের শীর্ষ অবস্থান দেশজুড়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দুর্নীতি দমন কমিশন, যার উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও স্বাধীনভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং আইনের শাসনকে শক্তিশালী করা। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, দুদক কি সত্যিই স্বাধীনভাবে তার মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে পারছে? আর সেই স্বাধীনতার প্রকৃত মাপকাঠিই বা কী?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০১৫ ও ২০১৬ সালে দুদকের কার্যক্রম নিয়ে একটি বিস্তৃত গবেষণা পরিচালনা করে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয় যে দুদকের বিভিন্ন পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিদ্যমান। নিয়ম অনুযায়ী দুদক দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে এবং প্রয়োজন হলে মামলা দায়ের করে, যার বিচার হয় আদালতে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তদন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে এসব মামলা উচ্চ আদালতে টিকে থাকতে পারে না।
বাংলাদেশে দুর্নীতির ধরন বিশ্লেষণ করলে সাধারণত দুটি প্রধান রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমটি হলো দৈনন্দিন প্রশাসনিক দুর্নীতি, যেখানে সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা পেতে গিয়ে ঘুষ বা অনিয়মের শিকার হন। দ্বিতীয়টি হলো রাজনৈতিক দুর্নীতি। পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০০৪ সালে দুদক প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনেক ক্ষেত্রে বিরোধী দলের নেতারাই তুলনামূলকভাবে বেশি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের পর এসব মামলার অনেকগুলোরই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ওঠে যে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার সমীকরণ বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে।
অথচ আদর্শ অবস্থায় এমনটি হওয়া উচিত নয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের মূল দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক বা আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যক্তি অপরাধকে প্রাধান্য দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং প্রয়োজন হলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ জন্য কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগপ্রক্রিয়া এমনভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে সেখানে দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ না থাকে এবং যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিরাই দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান।
তবে সুশাসন নিশ্চিত করতে শুধু তদন্ত বা মামলা দায়ের করাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন দুদকের কাঠামোগত সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। বর্তমানে দুদক একটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, যার গঠন ও কার্যাবলি পরিচালিত হয় সংসদে পাস হওয়া আইনের মাধ্যমে। এর ফলে কমিশনের নেতৃত্ব নিয়োগ, প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত কার্যক্রমেও রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের শঙ্কা তৈরি হয়।
আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের অভাব। নিজস্ব বাজেট না থাকায় ছোট ও বড় অনেক কার্যক্রমের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। এর ফলে যেমন তদন্ত কার্যক্রমের গতি কমে যায়, তেমনি আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি হয়।
এসব কারণে অনেক সময় জনগণের মধ্যেও দুদকের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। অনেকের ধারণা, প্রতিষ্ঠানটি কখনো কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে জনগণের আস্থা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য মোটেই শুভ লক্ষণ নয়।
সুতরাং দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রকৃত অর্থে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এর প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, নিয়োগপ্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষ করা এবং কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা জরুরি। একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক দুদকই পারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে এবং রাষ্ট্রে সুশাসনের ভিত্তিকে আরও দৃঢ় করতে।
শিক্ষার্থী, বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
