কিছু মানুষ আলো হয়ে আসেন জীবনের আঙিনায়,
জ্ঞান আর আদর্শের প্রদীপ জ্বালান নীরব মায়ায়।
কর্মস্থল বদলায়, বদলায় পরিচিত পথের বাঁক,
তবু তাঁদের স্মৃতি হৃদয়ে রাখে ভালোবাসার আঁক।
শিক্ষকতা কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণের নাম নয়; শিক্ষকতা হলো মানুষ গড়ার শিল্প, নৈতিকতার বীজ বপন এবং একটি প্রজন্মকে আলোকিত ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে দেওয়ার মহান দায়িত্ব। একজন প্রকৃত শিক্ষক তাঁর প্রজ্ঞা, ব্যক্তিত্ব, সততা ও আদর্শ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে যে জায়গা করে নেন, তা সময়ের সঙ্গে মলিন হয় না। কর্মস্থল বদলায়, দায়িত্বের পরিধি বাড়ে, কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থেকে যায় আজীবন। তেমনই একজন গুণী মানুষ চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সদ্য বিদায়ী শ্রদ্ধেয় বিভাগীয় প্রধান আ ন ম সিরাজুল ইসলাম স্যার।
সম্প্রতি পদোন্নতি পেয়ে কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে বদলি হয়েছেন তিনি। এই সংবাদে একদিকে যেমন আনন্দ ও গর্বের অনুভূতি কাজ করে, অন্যদিকে তেমনি মনজুড়ে তৈরি হয় বিদায়ের বিষাদ। একজন শিক্ষকের পদোন্নতি তাঁর কর্মজীবনের অগ্রযাত্রার স্বীকৃতি, আর তাঁর পরিচিত কর্মস্থল ছেড়ে চলে যাওয়া রেখে যায় স্মৃতিমাখা শূন্যতা। তাই স্যারের এই নতুন যাত্রা আমাদের জন্য আনন্দের হলেও তাঁকে আগের মতো কাছে না পাওয়ার ভাবনা কিছুটা মন খারাপেরও বটে।
ব্যক্তিত্বের সৌন্দর্য শুধু কথায় নয়, প্রকাশ পায় মানুষের নৈতিকতা, আচরণ ও দায়িত্ববোধে। সিরাজুল ইসলাম স্যারের মধ্যে এই গুণগুলোর সমন্বয় তাঁকে আমার দৃষ্টিতে একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে তুলে ধরেছে। একজন শিক্ষকের প্রকৃত মর্যাদা কেবল তাঁর পদবি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তিনি কতটা সততা, নিষ্ঠা ও মানবিকতা নিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করেন, তার মধ্যেই তাঁর প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে। স্যারের ব্যক্তিত্ব ও গুণাবলি থেকে আমি এই উপলব্ধিই পেয়েছি যে, মানুষের বড়ত্ব শুধু অর্জনে নয়, তার নৈতিক অবস্থানেও।
অর্থনীতি বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার কাছে এই বিভাগ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশ নয়; এটি আমার স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই পথচলায় শিক্ষকদের ভূমিকা অপরিসীম। তাঁদের দিকনির্দেশনা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস জোগায়, নতুন করে ভাবতে শেখায় এবং নিজেদের যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করে। একজন শিক্ষার্থীর জীবনে শিক্ষকের সামান্য উৎসাহও কখনো কখনো বড় অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। সেই জায়গা থেকেই স্যারের প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
বিদায়ের মুহূর্তে স্যারের সঙ্গে আমার প্রিয় সংগঠন ‘বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম’ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা নিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। তরুণদের লেখালেখি, সাহিত্যচর্চা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত এই সংগঠনটির কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁকে জানিয়েছি। পাশাপাশি সংগঠনের প্রকাশনা ‘তরুণের কলম’ ম্যাগাজিনটি তাঁর হাতে তুলে দিয়েছি। আমাদের সংগঠন সম্পর্কে জেনে স্যারের আনন্দিত হওয়া এবং আগ্রহ প্রকাশ করা আমার কাছে ছিল এক বিশেষ প্রাপ্তি। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলার যে ক্ষুদ্র প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি, সেই অভিজ্ঞতা একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারা আমার জন্য দারুণ আনন্দের।
স্যারের সঙ্গে এই কথোপকথন আমাকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। আমার ভবিষ্যৎ গঠনের পথে এমন ইতিবাচক উৎসাহ নিঃসন্দেহে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ, তরুণদের স্বপ্নের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তাদের সৃজনশীল উদ্যোগকে মূল্যায়ন করা একজন শিক্ষকের উদার মানসিকতারই পরিচয় বহন করে।
আমরা প্রায়ই বলি, একজন শিক্ষকের হাতে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্মিত হয়। কিন্তু সেই নির্মাণ শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় না। শিক্ষার্থীদের চিন্তাভাবনা, স্বপ্ন, মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাসের বিকাশেও শিক্ষকদের ভূমিকা থাকে। একজন শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণা হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান কোনো সাফল্য এনে দেয় না, কিন্তু তা ভবিষ্যতের পথচলায় সাহস জোগায়। স্যারের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার জায়গাটিও ঠিক এখানেই।
বিদায় মানেই সবকিছুর সমাপ্তি নয়। কিছু বিদায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়, আবার কিছু বিদায় স্মৃতির পাতায় বিশেষ একটি অধ্যায় হয়ে থাকে। সিরাজুল ইসলাম স্যারের কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজে নতুন কর্মজীবন শুরু হোক সাফল্য, সম্মান ও প্রাপ্তিতে পরিপূর্ণ, এটাই আমার আন্তরিক প্রত্যাশা। তাঁর জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও নৈতিক আদর্শ নতুন কর্মস্থলের শিক্ষার্থীদেরও আলোকিত করুক।
পরিশেষে, স্যারের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। কর্মস্থলের দূরত্ব হয়তো বাড়বে, কিন্তু একজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের প্রতি সম্মান কখনো দূরত্বের মাপে পরিমাপ করা যায় না। চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তাঁর স্মৃতি এবং শিক্ষার্থীদের মনে রেখে যাওয়া শ্রদ্ধার জায়গাটা চিরকাল অটুট থাকবে। কিছু মানুষ বিদায় নেন কর্মস্থল থেকে, কিন্তু থেকে যান হৃদয়ের গভীরে, শ্রদ্ধায়, স্মৃতিতে এবং আজীবনের অনুপ্রেরণায়।
