শিরোনাম:
Network News BD
রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস: সুরক্ষিত মেয়ে, আলোকিত সমাজ

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১:০২ AM ১৭ বার পঠিত
আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস: সুরক্ষিত মেয়ে, আলোকিত সমাজ

ছবি: ইউনিসেফ বাংলাদেশ

আজকের কন্যাশিশুই আগামী দিনের সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গড়ার কারিগর। একটি মেয়ে যখন নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, শিক্ষিত হয় এবং নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে, তখন সে কেবল নিজের ভবিষ্যৎই বদলায় না, বরং বদলে দেয় পুরো সমাজের চিত্র। কিন্তু এই আধুনিক যুগে এসেও বিশ্বের লাখ লাখ কন্যাশিশুর পথচলা মসৃণ নয়। বৈষম্য, সংঘাত আর দারিদ্র্যের মতো বাধাগুলো আজও তাদের স্বপ্নগুলোকে প্রতিনিয়ত গলা টিপে হত্যা করছে। এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে প্রতি বছর ১১ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস’।

মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ের বীজ বোনা হয়েছিল আজ থেকে বেশ কয়েক দশক আগে। ১৯৯৫ সালের কথা। চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন, যেখানে প্রায় ২০০টি দেশের ৩০ হাজার নারী-পুরুষ এক ছাদের নিচে জড়ো হয়েছিলেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল একটিই—নারী ও কন্যাশিশুদের অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে বিশ্বদরবারে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া। সেই সম্মেলনে স্বাক্ষরিত ‘বেইজিং ডিক্লারেশন’ আজও নারী অধিকার আদায়ের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রগতিশীল রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত। তবে দীর্ঘ এই পথচলায় বিশ্বজুড়ে নানা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলেও, মেয়েদের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতির অনেকটাই আজও অপূর্ণ থেকে গেছে।

বাস্তবতার চিত্রটি আসলে কতটা ভয়াবহ, তা কিছু পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্বে প্রতি বছর এক কোটি ২০ লাখেরও বেশি মেয়ের ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায়। সহজ হিসেবে, প্রতি তিন সেকেন্ডে একজন কন্যাশিশুকে বাধ্য হয়ে বসতে হচ্ছে বিয়ের পিঁড়িতে। এই হার যদি চলতে থাকে, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ নির্মূল করার যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা কোনোভাবেই অর্জন করা সম্ভব নয়। আরও ভীতিকর তথ্য হলো, ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের মধ্যে প্রায় প্রতি চারজনে একজন তাদের স্বামী বা সঙ্গীর মাধ্যমে শারীরিক কিংবা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। বিশেষ করে যুদ্ধবিগ্রহ, বাস্তুচ্যুতি ও অন্যান্য মানবিক সংকটের সময় বাল্যবিবাহ, যৌন সহিংসতা এবং মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। পড়াশোনা কিংবা কর্মক্ষেত্রেও ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা পিছিয়ে আছে। একই বয়সের ছেলেদের তুলনায় ১৫-১৯ বছর বয়সী মেয়েদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকার আশঙ্কা প্রায় দ্বিগুণ। আর সংঘাতপূর্ণ বা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে এই বৈষম্য এতটাই প্রকট যে, স্বাভাবিক পরিবেশের তুলনায় সেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ার হার প্রায় ৯০ শতাংশ বেশি।

এই নির্মম বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘বাল্যবিবাহের অবসান ঘটান এবং কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ করুন’। বাল্যবিবাহ কেবল একটি সামাজিক ব্যাধি নয়, এটি মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। অল্প বয়সে বিয়ের কারণে একটি মেয়েকে বাধ্য হয়ে স্কুল ছাড়তে হয়। অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের কারণে দেখা দেয় জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নানা শারীরিক জটিলতা। সেই সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হওয়ার ঝুঁকি তো থাকেই। বাল্যবিবাহের এই নেতিবাচক প্রভাব কেবল একটি প্রজন্মেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি যুগ যুগ ধরে পরিবার ও সমাজকে দারিদ্র্য এবং বৈষম্যের এক দুষ্টচক্রের মধ্যে আটকে রাখে।

এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে কেবল সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ এবং জোরালো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখা এই সমস্যার অন্যতম প্রধান সমাধান। বেতন মওকুফ, নিরাপদ স্কুল পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা মেয়েদের সহায়তা করার মাধ্যমে পরিবারগুলোকে বাল্যবিবাহের বিকল্প পথ দেখানো সম্ভব। একইসঙ্গে মেয়েদের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা এবং আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেন যেকোনো বিপদে তারা নির্ভয়ে সাহায্য চাইতে পারে। সবচেয়ে জরুরি হলো, পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত—প্রতিটি ক্ষেত্রে মেয়েদের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া। কারণ, নিজেদের পথে আসা বাধাগুলো একজন মেয়ের চেয়ে ভালো আর কেউ বুঝতে পারে না।

মেয়েদের এই অধিকার আদায়ের যাত্রায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে ইউনিসেফ। তাদের ‘গ্লোবাল গার্ল লিডারস অ্যাডভাইজরি গ্রুপ’-এর সহায়তায় ২০২৬-২০২৯ সালের জন্য একটি বিশেষ কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আগে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৪৭ মিলিয়নের বেশি মেয়ের কাছে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার ওপর ভিত্তি করেই এই পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। তবে এই লড়াই কেবল কোনো নির্দিষ্ট সংস্থা বা রাষ্ট্রের নয়। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এবং কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় আইন, নীতি ও বিনিয়োগের পক্ষে সোচ্চার হতে হবে। আজকের কন্যাশিশুর পেছনে করা সঠিক বিনিয়োগই পারে একটি সুস্থ, স্বাবলম্বী ও সমতাপূর্ণ পৃথিবীর ভিত্তি গড়ে দিতে। কারণ যখন একটি মেয়ে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পায়, তখন সে কেবল নিজের ভাগ্যই লেখে না, বরং পুরো বিশ্বকে আলোকিত করার ক্ষমতা রাখে।

ডিএ/

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!