কাজী মো. ইসমাঈল হোসেন:
আমরা সব সময় মানুষকে নিয়ে ভাবি। হঠাৎ একদিন মানুষকে নিয়ে একটি লেখা তৈরির ইচ্ছা হলো। তখন বাজে রাত দেড়টা। ফোনটা হাতে নিয়ে গুগলে খুঁজলাম, ‘মানুষ কাকে বলে?’ গুগল বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক তথ্য দিল। সেসবের সারাংশ ছিল এমন, মানুষ শুধু রক্ত মাংসে গঠিত কোনো প্রাণীর নাম নয়। মানুষ এক বিস্ময়কর সত্তা, যার ভেতরে জড়িয়ে আছে বুদ্ধি, অনুভূতি, বিবেক ও সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস। জীববিজ্ঞানের ভাষায় মানুষ হলো ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ প্রজাতির অন্তর্গত এক উন্নত স্তন্যপায়ী প্রাণী। তার বিশেষত্ব হলো চিন্তা করার ক্ষমতা, ভাষার ব্যবহার, সৃজনশীলতা ও সমাজ গঠনের দক্ষতা।
তবে মানুষকে কেবল বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ করা যায় না। দয়া, মমতা, ন্যায়বোধ, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধই মানুষকে প্রকৃত অর্থে ‘মানুষ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাই মানুষ একদিকে যেমন জীববিজ্ঞানের এক উন্নত সৃষ্টি, অন্যদিকে তেমনি মানবতা, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার এক জীবন্ত প্রতীক।
এসব পড়ার পর মনে হলো এলাকার মুরব্বিদের সেই পুরোনো কথার যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। তাঁরা বলতেন, ‘বাপু, মানুষের মতো মানুষ হও।’ এরপর থেকেই মানুষ নিয়ে আমার নতুন করে ভাবনা শুরু। আগেও ভাবতাম, তবে এবারের ভাবনাটা যেন একেবারেই অন্য রকম।
একবার এক রাতে এক বয়োজ্যেষ্ঠ লোকের সঙ্গে গল্প হচ্ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘ভালো মানুষ থাকে জান্নাতে, পৃথিবী ভরা শুধু অমানুষে।’ অথচ আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে ‘ইনসান’ বা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আর ইনসানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো অপরকে সম্মান করা, মর্যাদা দেওয়া এবং মানবিক হওয়া।
মানুষ নিয়ে ভাবতে ভাবতে শেষমেশ মানুষের কাছ থেকেই যেন অনেক দূরে পৌঁছে গেছি। ঘর ছেড়েছি, গ্রাম ছেড়েছি, শহর মফস্বল ছেড়ে মাঠের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কিছুদিন পর হয়তো পৃথিবীকেই ছেড়ে দেব। যেখানে মানুষ নেই, ঠিক সেখানে পৌঁছে যাব। আর তখন বারবার সেই কথাটাই মনে পড়ে, ‘সবচেয়ে ভালো মানুষ থাকে জান্নাতে, পৃথিবী ভরা শুধু অমানুষে।’
একজন ভালো মানুষকে দেখেও এখন আর সহজে ভালো ভাবার উপায় নেই। কোনো এক উপন্যাস কিংবা পত্রিকায় পড়েছিলাম, একটি পতিতাপল্লির দেয়ালে লেখা ছিল, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে ভদ্রলোকটিও এখানে এসে লজ্জা ভুলে কাপড় খুলে ফেলে। কিন্তু কেউ এখানে এসে কাউকে কাপড় পরিয়ে দেয় না।’
এসব ভাবতে ভাবতে মনে হলো, এত বছর পড়াশোনা করে এবং হাজার কিতাব পড়েও মানুষকে পুরোপুরি জানতে পারিনি। মানুষের মতো অবয়ব দেখলেই আমরা তাকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ ভেবে বসি। অথচ মানুষের সংজ্ঞার সঙ্গে মেলাতে গেলে মনে হয় মানুষ চেনা এখনো অনেক বাকি।
প্রতিটি মানুষকে বুঝতে গেলে তার সঙ্গে মিশতে হয়। আর কখনো কখনো বেশি মিশতে গেলে ভয়ংকরভাবে মানুষের আসল রূপ বেরিয়ে পড়ে। মানুষকে অতিরিক্ত জেনে ফেলাও কখনো কখনো মানুষের জন্য কাল বয়ে আনে। সুতরাং, মানুষ নামক এই জটিল সত্তার সঙ্গে মিশেই আমাদের নিজস্ব ভালো থাকার পথটি গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষার্থী, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
