নোবেল পুরস্কারের বিজয়ীর নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর ছবি। কিন্তু সেই ছবি অনেক সময় পরিচিত অর্থে কোনো আলোকচিত্র নয়। ক্যামেরায় তোলা ঝকঝকে ছবির বদলে দেখা যায় সাদা বা হালকা পটভূমিতে কালো রেখায় আঁকা মুখাবয়ব, সঙ্গে সোনালি পাতের ঝলক। নোবেলজয়ীদের পরিচিত এই বিশেষ প্রতিকৃতি এখন পুরস্কারটিরই এক ধরনের দৃশ্যমান স্বাক্ষর হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর শুরুটা ছিল একেবারেই অন্য কারণে।
২০১২ সালে শিল্পী নিকলাস এলমেহেড নোবেল মিডিয়ার আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ শুরু করেন। তখন একটি বাস্তব সমস্যা প্রায়ই সামনে আসত। নোবেল পুরস্কারের বিজয়ীদের নাম ঘোষণার সময় তাঁদের উপযুক্ত ও মানসম্মত ছবি সব সময় ইন্টারনেটে পাওয়া যেত না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাওয়া গেলেও ছবির মান ছিল এতটাই খারাপ যে তা দ্রুত প্রকাশিত সংবাদে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ত। অথচ নোবেল পুরস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণার খবর একটি ভালো ছবির জন্য আটকে রাখার সুযোগও নেই।
এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হিসেবে এলমেহেড বিজয়ীদের প্রতিকৃতি নিজেই আঁকতে শুরু করেন। প্রথমদিকে উদ্দেশ্য ছিল খুব সাধারণ, সংবাদ প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পরিষ্কার ছবি তৈরি করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই তাৎক্ষণিক সমাধানই পরিণত হয় নোবেল পুরস্কারের অন্যতম পরিচিত দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যে।

এই প্রতিকৃতিগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো গাঢ় কালো রেখার ব্যবহার। অতিরিক্ত রং বা জটিল ছায়া না থাকায় ছবিগুলো একদিকে যেমন সহজে চেনা যায়, অন্যদিকে সংবাদপত্রের পাতা থেকে শুরু করে মোবাইল ফোনের ছোট পর্দায়ও স্পষ্ট দেখা যায়। ফলে বিজ্ঞানের গবেষক, সাহিত্যিক কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রের বিজয়ী, সবাইকে একই ধরনের চিত্রভাষায় উপস্থাপন করা সম্ভব হয়। তৈরি হয় নোবেলজয়ীদের জন্য একটি অভিন্ন দৃশ্যমান পরিচয়।
তবে প্রতিকৃতির সঙ্গে যে সোনালি আভা এখন প্রায় অবিচ্ছেদ্য, সেটি শুরু থেকেই ছিল না। ২০১৭ সালে নোবেল ফাউন্ডেশন তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতিতে পরিবর্তন আনে। নোবেল পদকের ঐতিহ্য ও প্রতীকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সোনালি রংকে তাদের প্রধান দৃশ্যমান রং হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৮ সাল থেকে এলমেহেড তাঁর আঁকা প্রতিকৃতিতে সোনার পাত ব্যবহার শুরু করেন।
এখানেই রয়েছে ছবিগুলোর আরেকটি চমক। দূর থেকে দেখে অনেকের মনে হতে পারে, সোনালি অংশ হয়তো কোনো কম্পিউটার সফটওয়্যার কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে যোগ করা। বাস্তবে তা নয়। প্রতিকৃতিগুলো হাতে আঁকা। মোটা কাগজ বা তুলার কাগজে কালো অ্যাক্রিলিক রং ও মার্কার দিয়ে মুখের রেখা তৈরি করা হয়। এরপর বিশেষ আঠার সাহায্যে সেখানে বসানো হয় আসল ধাতব সোনার পাত। ফলে প্রতিটি প্রতিকৃতিতে ডিজিটাল ছবির বদলে হাতে তৈরি শিল্পকর্মের আলাদা একটি স্পর্শ থাকে।
একসময় ভালো ছবি না পাওয়ার সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে যে পদ্ধতির শুরু, সেটিই এখন নোবেল পুরস্কারের ঘোষণার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। প্রতি বছর নোবেল পুরস্কারের মৌসুমে বিজয়ীদের নামের পাশাপাশি কালো রেখায় আঁকা মুখ আর সোনালি পাতের ঝলক দেখলেই অনেকের কাছে বোঝা যায়, বিশ্বজুড়ে আলোচিত সেই সম্মাননার আরেকটি অধ্যায় শুরু হয়েছে।
নোবেলজয়ীদের এই প্রতিকৃতি তাই নিছক ছবি নয়। প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া একটি সৃজনশীল ধারণা কীভাবে ধীরে ধীরে একটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে পারে, তারও একটি সুন্দর উদাহরণ এটি।
শুভ্র/
