অলোক আচার্য:
শিক্ষকের সাথে একজন ছাত্রের এখন যে সম্পর্ক আমরা দেখছি আদতে এই সম্পর্ক মানে বর্তমানের অবিশ্বস্ততা, অসহিঞ্চুতা এবং অস্থিরতা দুই দশক আগেও ছিল না। শিক্ষককে দেখলেই মাথা নিচু করে সালাম দেওয়া ছিল রীতি বা অভ্যাস। স্যারকে দেখলে কোনো দোকানে দাঁড়ানোর সাহসও পেতাম না। এখন তো ধুমপান করতেও লজ্জা বোধ করে না। সময় যেভাবে বদলায় তার ধারাবাহিকতায় সবকিছুই বদলে যাচ্ছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রতিটি স্তরেই অনেক শিক্ষককে ভালো লেগেছে, আদর্শ মেনেছি এবং তাঁদের কারও কারও সাথে যোগাযোগও রয়েছে। শুধু আমার স্মৃতিতে যে শিক্ষকের মুখ ধারণ করা আছে সেসব মনে করি মনের ভিতরে। আমি পেশায় এখন একজন শিক্ষক। শিক্ষকতা পেশাকে আমি মনে প্রাণে ধারণ করি। আজ আমার ছাত্রছাত্রীরা আমাকে যেভাবে ধারণ করে আমিও আমার শিক্ষকদের সেভাবেই ধারণ করি। আমার শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই আমার কাছে প্রবল আকর্ষনীয়। তাদের ব্যক্তিত্ব আমাকে সবসময়ই মুগ্ধ করেছে। কারও কারও আদর্শ নিয়ে নিজেকে তৈরি করি। তাঁদের মতো হওয়ার চেষ্টা করি। কোনো শিক্ষকের কথা বলা, কোনো শিক্ষকের হাঁটা-চলা আমি অনুকরণ করি। সরাসরি কারও মতো হওয়া সম্ভব হয় না কিন্তু কিছুটা তো ধারণ করা যায়। স্মৃতিতে অনেক শিক্ষক রয়েছেন জেগে। এর মধ্যে যদি সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক নিয়ে দু’চার কথা লিখতে বা বলতে বলা হয় তাহলে প্রথমেই আসে বেড়া বিবি সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক রাজ্জাক স্যারের কথা। সহজ-সরল আচরণ, গভীর জ্ঞানের অধিকারী এবং সর্বদা ছাত্রছাত্রীদের নতুন কিছু শেখানোর প্রচেষ্টা মূলত ছাত্রছাত্রীদের কাছে তাঁর ব্যক্তিত্বকে আকর্ষণীয় করেছিল। এছাড়াও স্কুলের দীপক স্যার ছিলেন খুব নরম এবং হাস্যজ্জ্বল স্বভাবের। স্যারের সাথে আজও রাস্তায় দেখা হয়, কথা হয়। কলেজ জীবনের লুৎফর স্যারের কথা। কলেজে পড়ার দু’বছর আমার সাথে স্যারের ছিল একদিনে বন্ধু ও অন্যদিকে পিতা-পুত্রের মতো সম্পর্ক। স্যার ছিলেন বেড়া সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক। শুরু থেকেই স্যারের সহজ-সরল ভাবমূর্তি আমাকে আকর্ষণ করে। আমি এবং আমার কয়েকজন বন্ধু স্যারের কাছে প্রাইভেট নেই। সেই থেকে শুরু। আমরা যেন স্যারের একেবারে বুকের কাছে পৌছে যাই। স্যার একা থাকতেন। নিজেই রান্না করতেন। কোনোদিন দেখা যেত স্যারের রান্না করা খাবার আমরা খেয়ে নিতাম। তাতে অবশ্য স্যার স্যার কোনোদিন রাগ করেননি। আর বেতনের কথা কি বলবো! মুখ ফুঁটে কোনোদিন বেতন চাননি। যা পেরেছি সেটাই স্যারকে দিয়েছি। তাতে স্যারের অমত দেখিনি। স্যার প্রচুর পান খেতেন। মুখে হাসি ছাড়া কথাই বলতেন না। এভাবে স্যারের সাথে দুটো বছর দেখতে দেখতে কেটে যায়। আমরা উচ্চ শিক্ষার জন্য বাইরে চলে যাই। মাঝে মধ্যে বাড়িতে আসলে স্যারের সাথে দেখা করতাম। সেই আগের মতো কাছে ডেকে সব খবরাখবর জানতে চাইতেন। মন থেকে দোয়া করতেন। হঠাৎ একবার বাড়ি এসে দেখলাম স্যারের ঘর বন্ধ। খোঁজ নিয়ে জানলাম স্যার হঠাৎ ষ্ট্রোক করে মারা গেছেন। এটা শুনে আমি প্রচন্ড আঘাত পেলাম। আজও স্যারের সেই ডাক, স্যারের সেই হাসি, পান খাওয়া মুখ, রান্না করার স্মৃতি সব চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তাকিয়ে থাকি স্যারের থাকার ঘরের দিকে। সেখানে এখন নতুন ঘর উঠেছে। মনে হয় এইতো এখনি স্যার বেরিয়ে এসে বলবেন, কি রে আচার্য, তোর খবর কি? কবে বাড়ি আসলি? কিন্তু স্যার আসে না। কোনোদিন আসবে না। ভেজা চোখ দুটো বুঁজে আসে। সব স্যারেরা একদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিবে। কোনো কোনো শিক্ষক ইতোমধ্যেই চলে গেছেন। তবুও সব শিক্ষকের কথা মনে পড়ে। স্মৃতির মণিকোঠায় তাঁদের রেখেছি চিরকাল।
শিক্ষক ও লেখক, পাবনা।
