শিরোনাম:
Network News BD
সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

মুখস্থবিদ্যা নয়, গবেষণানির্ভর শিক্ষা চাই

রকমারি ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪ অক্টোবর ২০২৬, ৫:২৭ PM ৩৫ বার পঠিত
মুখস্থবিদ্যা নয়, গবেষণানির্ভর শিক্ষা চাই

প্রতীকী ছবি © সম্পাদিত

মোসা. আওরিয়া মিমি:

বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। আর নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, যুক্তি দিয়ে ভাবার সুযোগ এবং গবেষণানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশে এখনো পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষার প্রভাব স্পষ্ট। পাঠ্যবইয়ের তথ্য মনে রাখা এবং পরীক্ষার খাতায় তা পুনরুৎপাদন করাই যেন শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীর চিন্তা, অনুসন্ধান ও সৃজনশীলতার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কোনো শিক্ষার্থীর হাতে শুধু একটি সনদ তুলে দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। একজন শিক্ষার্থীকে নিজের চারপাশের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন করতে শেখানো, কোনো সমস্যাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে শেখানো এবং নতুন সমাধান খুঁজতে উৎসাহিত করাও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব। কিন্তু যখন শিক্ষার মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে পরীক্ষায় ভালো নম্বর, তখন শিক্ষার্থীর মধ্যে জানার আগ্রহের বদলে পরীক্ষায় কী আসবে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি শিক্ষার্থীকে উত্তর খুঁজতে শেখায়, প্রশ্ন তৈরি করতে শেখায় না। অথচ গবেষণার শুরুই হয় একটি প্রশ্ন থেকে। কেন একটি সমস্যা তৈরি হচ্ছে, এর কারণ কী, এর প্রভাব কতটা এবং এর সম্ভাব্য সমাধান কী হতে পারে, এসব প্রশ্ন নিয়ে কাজ করার সুযোগ না থাকলে গবেষণার মানসিকতা গড়ে ওঠে না।

শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য শ্রেণিকক্ষের শিক্ষাপদ্ধতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু শিক্ষক বক্তৃতা দেবেন এবং শিক্ষার্থীরা তা লিখে রাখবে, এমন পদ্ধতির পাশাপাশি আলোচনা, উপস্থাপনা, কেস স্টাডি, প্রকল্পভিত্তিক কাজ, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে। একটি বিষয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীর নিজস্ব মতামত কী, সে কীভাবে যুক্তি উপস্থাপন করছে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে তার চিন্তা কতটা কার্যকর, এসব বিষয়ও মূল্যায়নের অংশ হওয়া দরকার।

বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণাকে শিক্ষার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের ছোট পরিসরে গবেষণা করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। বিভাগগুলোতে নিয়মিত গবেষণা আলোচনা, সেমিনার ও উপস্থাপনার আয়োজন করা যেতে পারে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর যৌথ গবেষণার সুযোগ বাড়ানো দরকার। গ্রন্থাগার, গবেষণাগার, অনলাইন জার্নাল ও তথ্যভান্ডারে শিক্ষার্থীদের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

আইন শিক্ষার ক্ষেত্রেও গবেষণা ও বিশ্লেষণী দক্ষতার গুরুত্ব রয়েছে। একজন আইন শিক্ষার্থীকে শুধু আইন ও ধারার বিষয়বস্তু মুখস্থ করলে হবে না। তাকে আইনের প্রয়োগ, মামলার নজির, সামাজিক বাস্তবতা এবং একটি আইনি সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বিশ্লেষণ করতে শিখতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের আইনজীবী, বিচারক, গবেষক কিংবা নীতিনির্ধারকের জন্য যুক্তি, বিশ্লেষণ ও গবেষণার দক্ষতা অপরিহার্য।

দেশ ও মানুষের কল্যাণে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল চিন্তাচেতনার বিকাশ অত্যন্ত জরুরি। একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, যখন তার শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষার উত্তর লিখতে নয়, সমাজের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে এবং সেগুলোর সমাধান নিয়ে ভাবতে শেখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা যদি সমাজ ও রাষ্ট্রের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে সেই গবেষণা জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি জনকল্যাণেও ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই উচ্চশিক্ষায় পরিবর্তনের জন্য শুধু পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করলেই হবে না। শিক্ষাদান, মূল্যায়ন এবং গবেষণার পুরো প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে হবে। পরীক্ষায় মুখস্থ তথ্যের পরিবর্তে বিশ্লেষণ ও যুক্তির মূল্যায়ন বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে হবে। ভুল করার ভয় কাটিয়ে নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন একটি জায়গা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না, নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারবে এবং প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু ভাবতে পারবে। মুখস্থবিদ্যা হয়তো পরীক্ষার খাতায় নম্বর এনে দিতে পারে, কিন্তু গবেষণানির্ভর শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীকে বাস্তব জীবনের সমস্যা মোকাবিলার সক্ষমতা তৈরি করে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাই প্রত্যাশা, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে গবেষণা, বিশ্লেষণ, যুক্তি ও মননশীল চর্চার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা হবে। শিক্ষার্থীদের হাতে শুধু একটি সনদ নয়, প্রশ্ন করার সাহস এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতাও তুলে দিতে হবে। তাহলেই বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রকৃত দায়িত্ব পালন করতে পারবে।

লেখক: শিক্ষার্থী (আইন বিভাগ), ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!