মোসা. আওরিয়া মিমি:
আজ যার কথা লিখতে বসেছি, তিনি আমার জীবনে সাময়িক সময়ের জন্য পাওয়া একজন অসাধারণ মানুষ। কিন্তু তার অবদান অপরিমেয়, আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে। আমি তখন খুলনা সিটি কলেজে ভর্তি হয়েছি। গ্রাম থেকে প্রথমবারের মতো শহরে আসা। বাড়ি ছেড়ে এত দূরে থাকা। সবই ছিল খুব নতুন, অচেনা আর যথেষ্ট কষ্টদায়ক। আমার পরিচিত তেমন কেউ ছিল না। যে এক বা দুজন ছিল, তারা তখন শহুরে পরিবেশে বদলে গেছে প্রায় পুরোপুরি। আমি কলেজে যেতাম। ক্লাস করতাম। আবার ফিরে আসতাম আমার মেসে। এভাবেই চার মাস পেরিয়ে গেল।
হঠাৎ একদিন ইংরেজি ক্লাসে একজন নতুন স্যার আসলেন। নতুন মুখ, পড়ার ধরন ভিন্ন আর তার বৈশিষ্ট্যও আগের দুই চেনা শিক্ষক থেকে অন্যরকম মোহনীয়। স্যার হেসে হেসে শেখাতেন। তার ছাত্র-ছাত্রীরা তার সাথে মিশতে পারত। অনুভূতি ভাগাভাগি করতে পারত। এক কথায় তিনি ছিলেন এক অসামান্য মানুষ। আশ্চর্যজনকভাবে আমার মনে হলো স্যারের সান্নিধ্য আমায় নতুন আর শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে পারে। আমি স্যারের কাছে ইংরেজি পাঠ শুরু করলাম। দিনে দিনে বুঝতে পারলাম, তিনি কতটা আন্তরিক আর পরিশ্রমী তার শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে। তিনি একেকজন করে প্রত্যেকের সমস্যাগুলো, ব্যর্থতার কারণগুলো খুঁজে বের করতেন। পর্যবেক্ষণ করতেন। আমাদের অভাবগুলো মেটাবার সরঞ্জাম সরবরাহ করতেন।
একবার আমার বাবা অনেক অসুস্থ ছিলেন। পরিবারে কিছু আর্থিক টানাটানি পড়ল। স্যারের মাসিক বেতন দিতে সামান্য কদিন দেরি হলো। তিনি আমায় একান্তে, সকলের অগোচরে বললেন, “তোমার আমাকে পুরো টাকা দেওয়া লাগবে না। তুমি আমায় কম টাকা দিও।”
কিন্তু আমি স্যারের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললাম, “খুব সমস্যা যখন হবে আমিই আপনাকে বলব স্যার।”
স্যার আর কিছু বলেননি। আমারও কখনো স্যারকে কম দেওয়ার দরকার পড়েনি। জীবনে অনেক শিক্ষক পেয়েছি। কিন্তু তার মতো এত বিজ্ঞ, জ্ঞানী আর সাদামাটা মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। তিনি প্রকৃত গুণী। কেননা তার অনেক জ্ঞান, তবে কোনো অহংকার নেই। আমরা যারা তার শিষ্য আছি, হয়তো নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে পারব যে, জীবনে এত এত গুরুর মধ্যে তিনিই একমাত্র যিনি বিনা অর্থে আমাদের পাঠ দান করেছেন, উপহার হিসেবে।
এরপর আমার কলেজ শেষ হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং করছি। কিন্তু সেসব ইংরেজি ব্যাকরণ আমার উক্ত শিক্ষকদের দ্বারা বোধগম্য হতো না। আমি স্যারের নিয়মে ততদিনে নিজেকে গড়ে ফেলেছিলাম। তাই অন্য শিক্ষকের নিয়ম যতই সাবলীল হোক না কেন, আমি ধরতে পারতাম না। নিরুপায় হয়ে স্যারের শরণাপন্ন হলাম। স্যার আমাকে যথারীতি নিরাশ করলেন না। তাকে নিয়ে যে বিশ্বাস আমার ছিল, তা টিকে গেল এবং আরও অটুট হলো।
স্যারের নিয়মিত ক্লাস, পড়ানো ও বাকি অনেক দাপ্তরিক ব্যস্ততা ছিল। তাই তিনি আমাকে প্রতি সপ্তাহের রবিবার সময় নির্ধারণ করে দিলেন। আমি আমার শিক্ষকের কাছে সমস্ত সপ্তাহের সমস্যা নিয়ে যেতাম। আর তিনি তা সব ধৈর্য ধরে সমাধান শেখাতেন আমাকে। আমিও কেমন যেন স্যারের মতো করে আর কারো থেকে বুঝতাম না। আমি চার মাস বা তার অধিক সময় স্যারের সময় নিয়েছি। আর তা সব ছিল বিনামূল্যে। আমার মনে দ্বিধা হতো স্যার যদি কোনো দিন বিরক্ত হন। কিন্তু তিনি তেমন নন। তিনি একজন ভালো মানুষ, আর আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।
এই ঋণের কথা আমি যতদিন বেঁচে থাকি আর যেথায় থাকি সারাজীবন বলে যাব। আমি আমার অগ্রজদের শুনিয়ে যাব, টাকা ছাড়া, কোনো স্বার্থ ছাড়া যে খুলনা শহরে কোনো বিসিএস ক্যাডারের সময় পাওয়া যায়, আমার মিঠুন স্যারকে না দেখলে জানতে পারতাম না। স্যারের প্রতি সদাসর্বদা সম্মান ও পরম ভক্তি হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে।
বলা হয়, গুরুদক্ষিণা ছাড়া গুরুর শিক্ষা পূর্ণ হয় না। আমি বলব, আমার সারাজীবনই আমার গুরুর জন্য দক্ষিণা।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
