শিরোনাম:
Network News BD
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং, ইতিহাসের এক জীবন্ত যাদুঘর

তাসরিফা পুষ্পিতা রোশনি

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ৯:৪৭ AM ১৯৬ বার পঠিত
পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিং, ইতিহাসের এক জীবন্ত যাদুঘর

ছবি: সংগৃহীত

পুরান ঢাকার পুরনো অলিগলির ভেতর দিয়ে হাঁটলে সময় যেন পিছিয়ে যায় অনেক বছর। রিকশার টুংটাং শব্দ, ইলিশ ভাজার গন্ধ, আর ইটের পুরনো বাড়ির ভিড়ে হঠাৎ চোখে পড়ে একটা হলুদ রঙের জীর্ণ দোতলা বাড়ি। কারুকাজ করা কাঠের জানালা, লম্বা বারান্দা। নীল রঙে মলিন হয়ে লেখা “বিউটি বোর্ডিং”। মনে হয় কোনো পুরনো কবিতার বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসেছে বাড়িটি। মহাদেব সাহা ঠিকই বলেছিলেন, “যেন পুরোনো দিনের কোন গান, শ্রাবণের বৃষ্টিধারা যেন নির্জন একটি বাড়ি বিউটি বোর্ডিং।”
এই বাড়িটা শুধু ইট-কাঠ না। ভোজন রসিকদের জন্য এখানে আছে নানারকম স্বাদের সমারোহ। বিউটি বোর্ডিং এ ঢুকলেই প্রথমে সুস্বাদু খাবারের সমারোহ দেখে মন ভরে যায়। এখানকার রান্না মানে পুরান ঢাকার আসল স্বাদ। সারা বছর এখানে পাওয়া যায় গরম গরম ভাতের সাথে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী টাটকা সরষে ইলিশ, আলু ভর্তা, ডাল। বিকেলের আড্ডার বিশেষ খাবার গরম গরম সিঙ্গারা আর চা। আর শেষে মাটির হাঁড়ির টক দই। একটা সময় ছিল যখন সাহিত্যিকরা আড্ডার ফাঁকে চায়ের কাপ হাতেই কবিতা লিখতেন। ঢাকার সেই ঐতিহ্য আজও আছে। পেট ভরে খেয়ে দোতলায় ২০০-২৫০ টাকায় রাতও কাটানো যায়। খাবারের সাথে মিশে আছে গ্রাম বাংলার ঘরোয়া স্বাদ আর পুরান ঢাকার খানদানি রান্নার গন্ধ।
এই স্বাদের পেছনে লুকিয়ে আছে প্রায় শতবর্ষের পুরনো ইতিহাস। একসময় বাড়িটি ছিল নিঃসন্তান জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের। ১৯৪৭ এর আগে এখানে “সোনার বাংলা” পত্রিকার অফিস ছিল। কবি শামসুর রহমানের প্রথম কবিতা এখানেই ছাপা হয়। পরে ১৯৪৯ সালে দুই ভাই প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা ও নলিনী মোহন সাহা ১১ কাঠা জমির উপর এই বাড়ি ভাড়া নিয়ে “বিউটি বোর্ডিং” প্রতিষ্ঠা করেন। নলিনী মোহনের বড় মেয়ে “বিউটি”র নামেই এর নামকরণ। চল্লিশের দশক থেকে এখানে আড্ডা বসাতেন বাংলা সাহিত্যের সব দিকপাল। কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা – এদের পায়ের ছাপ লেগে আছে এই বারান্দায়।
আজও এখানে সেই বিখ্যাত চেয়ারটা রাখা আছে যে চেয়ারে বসে নাগরিক কবি শামসুর রাহমান কবিতা লিখেতেন।সাহিত্যপ্রেমীরা দূর দুরান্ত থেকে আসে শুধু ওই চেয়ারটা একবার ছুঁয়ে দেখতে।
এখানে বসেই আব্দুল জব্বার খান লিখেছিলেন বাংলার প্রথম সবাক ছবি “মুখ ও মুখোশ”। সুরকার সমর দাস এখানে বসে সুর দিয়েছেন। ১৯৫৭ সালে এখান থেকে প্রকাশিত হয় “কবিকণ্ঠ”, ১৯৫৯ সালে “স্বদেশ”। তাজউদ্দীন আহমদও এসে বসেছেন এই চায়ের টেবিলে। কিন্তু এই আড্ডাই ছিল পাকিস্তানিদের চক্ষুশূল। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ তারা হামলায় শহীদ করেন প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহাসহ ১৭ জনকে। পরে প্রহ্লাদ চন্দ্রের পরিবার ভারত গমন করে।
আজ আর আগের মতো আড্ডা নেই। রুমগুলো ফাঁকা। তবুও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে শুধু একবার ছুঁয়ে দেখতে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রহ্লাদ চন্দ্রের স্ত্রী শ্রীমতী প্রতিভা সাহা দুই ছেলে সমর সাহা ও তারক সাহাকে নিয়ে আবার বিউটি বোর্ডিং চালু করেন। ১৯৯৮ সালে হয়েছে “আড্ডা পুনর্মিলনী”, ২০০০ সালে গঠন হয়েছে “বিউটি বোর্ডিং সুধী সংসদ”। তারাই আজও লোকসান দিয়ে হলেও ঐতিহ্যটা ধরে রেখেছেন। মুখর আড্ডা আগের মতো না থাকলেও খাবার ঘরে এখনো খদ্দের ভিড় লেগেই থাকে।
এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটিতে আসার রাস্তা খুবই সহজ। গুলিস্তান বা সদরঘাট থেকে একটা রিকশা নিয়ে বাংলাবাজার যাবেন। শ্রীশচন্দ্র লেনের মুখে নেমে যে কোনো দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে থাকা হলুদ বাড়ি বিউটি বোর্ডিং।
বিউটি বোর্ডিং শুধু একটি হোটেল নয়। এটি আমাদের হারিয়ে যাওয়া আড্ডা, আমাদের প্রতিবাদ আর আমাদের স্বাদের স্মারক। ফুল ঝরে যাক, পাখি উড়ে যাক, তবু বিউটি বোর্ডিং বেঁচে থাকুক। বিউটি বোর্ডিং ইতিহাস ঐতিহ্যের এক জীবন্ত আতুরঘর। নতুন প্রজন্মের সদস্য হিসেবে আমাদের উচিত এই গল্পগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা। কারণ বিউটি বোর্ডিং একটি বাড়ি নয়, এটি আমাদের ইতিহাসের স্মৃতির অংশ।
লেখক: তাসরিফা পুষ্পিতা রোশনিশিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!