মহিউদ্দিন মহিন:
আমাদের শৈশবে বনেবাঁধারে উড়ে উড়ে শুধু ভ্রমরই মধু খেত না—আমরাও খেতাম। শৈশবের দুরন্ত দিনগুলোতে আমরা ছিলাম প্রকৃতির অকৃত্রিম সন্তান। বনেবাঁধারের ঝোপঝাড়ে, বুনোফুলে ভরা পথে পথে ঘুরে বেড়িয়ে ফুলের বৃন্তে লুকিয়ে থাকা এক ফোঁটা মধু খুঁজে নেওয়াই ছিল আমাদের সবচেয়ে আনন্দের কাজ। মেঠোপথের ধারে কিংবা জঙ্গলঘেরা ঝোপে ছুটে বেড়ানো সেই দিনগুলো আজ কেবল স্মৃতির পাতায়।
আমাদের শৈশবের চারপাশের পরিবেশ ছিল ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ। বনজঙ্গলজুড়ে ফুটত অসংখ্য প্রজাতির বুনোফুল। কোথাও সাদা, কোথাও লাল, কোথাও আবার হলুদ কিংবা বেগুনি—রঙের মেলায় প্রকৃতি নিজেই যেন উৎসবে মেতেছিল। প্রতিটি বুনোফুলের বৃন্তে লুকিয়ে থাকত এক ফোঁটা মধু, আর সেই মধুর টানে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াত মৌমাছি, প্রজাপতি আর নানা রকম কীটপতঙ্গ। মৌ মৌ গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে থাকত গোটা গ্রাম্য পরিবেশ।
বছরের বিশেষ সময়ে রাস্তার পাশের ঝোপঝাড়ে বাসক গাছে ফুটত অসংখ্য ফুল। সাধারণ সাদা পাপড়ির মাঝখানে রক্তিম আলপনার মতো আঁকা সে ফুল আমাদের শৈশবের চোখে ছিল অপূর্ব শিল্পকর্ম। আমরা বন্ধুদের নিয়ে বাসকের বনে হারিয়ে যেতাম আপন মনে। খুব যত্নে, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাসক ফুল তুলে নিতাম হাতে। তারপর তার বৃন্তে থাকা এক ফোঁটা মধু ঠোঁটে ধরে জোরে টান দিতাম। আহা! কী যে অমৃতস্বাদ—মধুর সেই মিষ্টতা জিহ্বায় লেগে চোখ বন্ধ করে আমরা যেন অমৃতের সুধাই পান করতাম।
আমাদের শৈশবে রাস্তাঘাটের দু’পাশ ছিল বনজুঁই ফুলের গাছে পরিপূর্ণ। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে সাদা রঙের সেই ফুল ফুটে উঠত, আর আমরা সেই ফুলের বৃন্ত চুষে মধু খেতাম। কাঁটা মান্দার গাছে ভরা ছিল আমাদের বাগান-বাগিচা। অসংখ্য লাল রঙের ফুল ফুটত সেখানে। আমরা গাছে উঠে ফুলের বৃন্ত হাতে নিয়ে চুষে চুষে মধু খেতাম। আহা, কী স্বাদ! আজও সেই তৃপ্তি কল্পনার জিহ্বায় লেগে থাকে।
বুনো পার্টি গাছের লম্বা সাদা ফুল ফুটলে আমরা তা ছিঁড়ে এর মধু চুষে খেতাম। লঙ্কা জবা গাছে ফুল ফুটলে পুরো এলাকা লাল রঙে রাঙা হয়ে উঠত। একটি ফুলের বৃন্তে প্রায় তিন-চার ফোঁটা মধু থাকত। আমরা মৌমাছির মতো করে ফুলের বৃন্ত মুখে নিয়ে চুষে চুষে মধু খেতাম।
আমাদের শৈশবে জ্যৈষ্ঠ মধু গাছ ছিল এক বিশেষ আশীর্বাদ। এর ফুলে ছড়াত মৌ মৌ গন্ধ, আর ফল ও ফুল—উভয়ই ছিল মধুর মতো মিষ্টি। তাই তো এই গাছের নাম জ্যৈষ্ঠ মধু গাছ। আমরা তৃপ্তি সহকারে এর ফল ও ফুলের মধু উপভোগ করতাম।
এ ছাড়াও আমাদের শৈশবে অসংখ্য নাম না জানা বুনোফুল ফুটে থাকত। এসব ফুলে মৌমাছির আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। মৌমাছিরা ফুলে ফুলে উড়ে উড়ে মধু সংগ্রহ করত, মৌচাক ভরে তুলত খাঁটি মধুতে। আমাদের মধ্যেই একটু বড় ও অভিজ্ঞ শৈশবের সাথীদের কেউ কেউ মৌচাক কেটে মধু সংগ্রহ করত। আহা! খাঁটি মধুর স্বাদ যে কত আলাদা—তা শুধু গ্রামবাংলার সন্তানরাই জানে।
আমাদের শৈশবে নানা প্রজাতির মৌমাছির বাস ছিল পরিবেশজুড়ে। এক জাতের মৌমাছি বড় গাছের ফোকরে বাসা বাঁধত। এরা ছিল খুবই ছোট, হলদেটে রঙের, দেখতে প্রায় মাছির মতো। আমরা এদের মৌচাক চিনতাম “মউচ্ছাপাতা” নামে। এই মউচ্ছাপাতা মৌচাকের মধু ছিল স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। আকারে ছোট হলেও এসব মৌচাকে থাকত পরিপূর্ণ মধু।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বদলে গেছে। ফসলি জমিতে অবাধে কীটনাশকের ব্যবহার, নির্বিচারে বনজঙ্গল কেটে ফেলা, যত্রতত্র বসতবাড়ি স্থাপন, ইটভাটায় জ্বালানির জন্য গাছ কাটা, খেজুরের গুড় তৈরিতে অতিরিক্ত লাকড়ির ব্যবহার, ধান সিদ্ধ করার চুলায় গাছ-গাছালি কেটে লাকড়ি বানানো, আর অদক্ষ হাতে মৌচাক কেটে মৌমাছির শুককিট অবাধে মেরে ফেলা, মৌমাছি তাড়াতে গিয়ে মৌমাছি পুড়িয়ে মারা—এসবের ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে মৌমাছির অসংখ্য প্রজাতি।
মধু সংগ্রহের লোভে মৌচাক পরিপূর্ণ হওয়ার আগেই বারবার কেটে ফেলার কারণে মৌমাছিরা তাদের নিরাপদ আশ্রয় হারিয়েছে। বনজঙ্গল উজাড় হওয়ায় আমাদের শৈশবের সেই মধুময় পরিবেশ আজ প্রায় বিলুপ্ত। হারিয়ে গেছে মৌমাছির গুঞ্জন, বুনোফুলের রঙিন হাসি আর শৈশবের সেই অমৃতস্বাদ।
আজ এসব কেবল স্মৃতি—আমার শৈশবের আত্মকথা, যেখানে প্রকৃতি ছিল জীবন্ত, মধু ছিল সহজলভ্য, আর জীবন ছিল নিখাদ ও মিষ্টি।
লেখক: প্রফেসর, ভোলা ইসলামিয়া ইউনানী মেডিকেল কলেজ।
