আজ বিশ্ব বেতার দিবস। যান্ত্রিক শহরের জ্যাম কিংবা নিঝুম রাতের নিঃসঙ্গতা একসময় এফএম রেডিও ছিল আমাদের নিত্যসঙ্গী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাপটের আগে রেডিওর অদৃশ্য তরঙ্গে ভাসত আমাদের আবেগ, ভালোবাসা আর রোমাঞ্চ। কয়েমজন তরুণের লেখায় উঠে এসেছে সেই সোনালি দিনের কথা।
বেতারের সুরে বাঁধা কৈশোর
মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন
বিশ্ব বেতার দিবস এলেই কৈশোরের সেই সুরভিত দিনগুলো কানে ভেসে আসে। এফএম রেডিও ছিল আমাদের গোপন আশ্রয়—নিঃসঙ্গ বিকেল, দীর্ঘ যানজট কিংবা অগোচর মধ্যরাতে। পড়ার টেবিলে বই খোলা থাকলেও মন ভেসে যেত তরঙ্গের ওপারে। কোনো এক প্রিয় কণ্ঠ গল্প শোনাত, গান শোনাত, আর অচেনা মানুষের আবেগকে শব্দে সাজিয়ে দিত।
তখন রেডিও ফুর্তি কিংবা এবিসি রেডিও-র অনুষ্ঠান ছিল প্রতিদিনের প্রতীক্ষা। গভীর রাতের লাইভ শো যেন এক অদৃশ্য মিলনমেলা—প্রিয়জনের উদ্দেশে গান উৎসর্গ, ক্ষুদে বার্তায় লুকোনো না বলা ভালোবাসা, আর নিজের নামটি উচ্চারিত হওয়ার অপার আনন্দ। সেই মুহূর্তগুলো মনে হতো শুধুই আমার, অথচ শুনছিল হাজার মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আগের দিনে বেতারই ছিল অনুভূতির সেতু। সেখানে বন্ধুত্ব গড়ে উঠত কণ্ঠের মাধ্যমে, ভালোবাসা পৌঁছে যেত সুরের ডানায় ভর করে। আজও হঠাৎ কোথাও রেডিওর সুর কানে এলে মনে হয়, সময় থমকে গেছে।
শিক্ষার্থী, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ।
বেতার এবং আমি
নাঈমা ইসলাম
ছোটবেলায় একবার বড়খালার বাসায় কেমন একটা বাক্স দেখে আপুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপু এটা কী? তখন আপু বলেছিল, চল তোকে গান শুনাই, এটা অনেক সুন্দর গান করে। ব্যাস, সেই থেকেই রেডিওর সাথে আমার পরিচয়।
তারপর হাইস্কুলে পড়াকালীন সময়। সেই ২০১২/২০১৩ হবে। তখনও নিজের মোবাইল ফোন ছিল না। কিন্তু ওই যে ছোটবেলার গান শোনার নেশা, সেটা কি আর সহজে যায়! তাই চুরি করে মায়ের ফোনেই এফএম-এর শো-গুলো শুনতে লাগলাম। চোখে না দেখেও যে তাদের গল্প, আড্ডা, গানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেতে থাকা যায়, তা রেডিও না শোনা জেনারেশন কখনো অনুভব করতে পারবে না। ‘ভূত এফএম’ শোনার জন্য একসময় অধীর আগ্রহে বসে থাকত পুরো একটা জেনারেশন। রেডিও আমাদের জন্য একটা নস্টালজিয়া। আহা, বৃষ্টির ছমছম শব্দের সাথে কত সন্ধ্যা, কত রাতের যে রেডিওর সুর মিশে আছে স্মৃতির পাতায়! চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় সেই অনুভূতিগুলো আজও তাজা। সত্যি খুব মিস করি সেই ফেলে আসা রেডিওর দিনগুলোকে।
শিক্ষার্থী, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ।
সময়ের বিবর্তনে ঐতিহ্যের সুর
সুরাইয়া ইয়াসমিন সুমি
পুরনো দিনের এফএম রেডিও-এর সেই কথাগুলো যেন স্মৃতি হয়ে গেঁথে রয়েছে। বাটন ফোন মানেই এফএম রেডিও। ফোনের সাথে তারওয়ালা হেডফোন গুঁজে জানালার পাশে বসে রেডিও শোনা ছিল এক পরম শান্তি। কারণ ওই তারটাই ছিল এন্টেনা!
পড়ার ফাঁকে ফাঁকেও কানে ইয়ারফোন দিয়ে আরজে উদয়ের ৯৪.৪-এর ‘ভূত স্টুডিও’ প্রতি বৃহস্পতিবার নিয়ম করে শোনা হতো। তাছাড়া প্রতি শনিবার অপেক্ষায় থাকতাম ‘লাভ স্টোরি’ শোনার জন্য, যা রাত ১০টায় হতো। প্রিয় কোনো গান শোনার জন্য চিরকুট পাঠানো বা ফোন করে রিকোয়েস্ট করার সেই রোমাঞ্চটাই ছিল আলাদা। রেডিও ছিল আমাদের সেই বন্ধু, যাকে আমরা কখনো দেখিনি কিন্তু যার কণ্ঠ আমাদের একাকীত্ব দূর করে দিত।
শিক্ষার্থী, সরকারি বি এল কলেজ, খুলনা।
বিনোদন নয়, বিশ্বস্ত কণ্ঠ সজীবতার সঙ্গী
উম্মে সালমা
এফএম রেডিওর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের পুরনো মুহূর্তগুলো, যা আজ স্মৃতি হয়ে আছে। বয়সটা তখন আবেগ বোঝার, অনুভূতি ধারণ করার। সেই সময়ে দুপুর ৩টার পর কিংবা সন্ধ্যার পর, রাতের সময়টা চমৎকার সঙ্গী হিসেবে কাজ করত রেডিও। আরজেদের উপস্থাপনা, গুছিয়ে কথা বলা, কথার ফাঁকে শায়েরী, নতুন-পুরানো বাংলা গান—সব কিছু মনে পড়ে।
দিনের সব কাজের মতো এফএম রেডিও শোনাও নিত্যদিনের একটা কাজ ছিল। ইন্টারনেটের যুগে আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছি সেই সুন্দর মুহূর্তগুলো। কিন্তু এখনো ট্রেনে বসে কানে হেডফোন গুঁজে এফএম রেডিও ছেড়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করলে সেই পুরনো মুহূর্তগুলো স্মৃতিমধুর হয়ে ওঠে। এফএম রেডিও শুধু আওয়াজ নয়, এটা ছিল মানুষের দুঃখের সাথী, সুখের মুহূর্ত, কাজের ফাঁকে স্বস্তির আভা।
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ।
প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে শোনার মাধ্যম। তবুও তারওয়ালা ইয়ারফোন আর রেডিওর সেই নস্টালজিয়া আজও আমাদের মনে অমলিন। বিশ্ব বেতার দিবসে সকল শ্রোতা ও কলাকুশলীদের জানাই শুভেচ্ছা।
