মৃত্যু প্রকৃতির এক ধারাবাহিক নিয়ম, তবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট এক অনাকাঙ্ক্ষিত আহাজারি। সড়ক দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ ঘটনা নয়, এটি একধরনের কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। বর্তমানে দেশের সড়কগুলো যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। পিচঢালা সড়কে প্রতিনিয়ত ঝরে যাচ্ছে শত শত তাজা প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাজারো মানুষ।
একজন কর্মক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে গোটা পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসে। তাঁরা আপনজন হারানোর পাশাপাশি আর্থিকভাবেও চরম অসহায় হয়ে পড়েন। একজন কর্মক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, বরং দেশ হারায় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা একজন দক্ষ জনশক্তিকে। সড়ক দুর্ঘটনা ক্রমশ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। যদিও সড়ক দুর্ঘটনা পুরোপুরি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব নয়, তবে নিম্নোক্ত উপায়গুলোর মাধ্যমে তা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব:
প্রথমত, সরকার অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুল থেকে চালকদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যুতে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা কঠোরভাবে নেওয়া। এর পাশাপাশি অনলাইন ও অফলাইন সচেতনতামূলক ক্লাস চালু করা।
দ্বিতীয়ত, সড়কে স্পিড লিমিট বোর্ড স্থাপন এবং তার পাশে স্পিড ক্যামেরা বসানো। অতিরিক্ত গতি বা ওভারস্পিডিং করলে ডিজিটালভাবে জরিমানা করা। এ ছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ক্যাম্পেইন ও রোডশোর আয়োজন করা।
তৃতীয়ত, প্রতিবছর গাড়ির বাধ্যতামূলক ফিটনেস সনদ নবায়ন করা। অনলাইন ফিটনেস চেকিং সিস্টেম চালু করে ডিজিটাল রেকর্ড রাখা এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ির চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
চতুর্থত, নিয়মিত সড়ক সংস্কার ও মানসম্পন্ন নির্মাণকাজ নিশ্চিত করা। শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলোতে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা। এ ছাড়া বিকল্প রুট ও বাইপাস সড়ক তৈরি করা।
পঞ্চমত, সিগন্যাল সিস্টেমকে স্বয়ংক্রিয় ও শক্তিশালী করা। ডিজিটাল ট্রাফিক মনিটরিং ক্যামেরা বসিয়ে আইন অমান্যকারীদের জন্য জরিমানার ব্যবস্থা করা এবং গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রাফিক আইনবিষয়ক প্রচার চালানো।
ষষ্ঠত, সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা। রাস্তার পাশে পার্কিং নিষিদ্ধ করা এবং শহরে বহুতল বা মাল্টিস্টোরি পার্কিং সুবিধা তৈরি করা। সেই সঙ্গে স্কুল কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ট্রাফিক আইন বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করা।
উল্লিখিত ব্যবস্থাগুলো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে যেমন চালকের ভুল থাকে, তেমনি রাস্তাঘাট, ট্রাফিক ব্যবস্থা, যাত্রী ও পথচারীর আচরণও সমানভাবে দায়ী। সম্মিলিত উদ্যোগ, সচেতনতা এবং কার্যকর প্রতিকারের মাধ্যমেই এই মৃত্যুমিছিল অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নিয়ম মেনে সতর্কতার সঙ্গে পথ চলাই পারে সবার নিরাপদে ঘরে ফেরা নিশ্চিত করতে।
জান্নাত আক্তার শিলা, শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
