শিরোনাম:
Network News BD
বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

মানুষের মনের অন্ধকার দিক বাইরের পৃথিবীর চেয়েও জটিল: শফিক রিয়ান

শব্দশৈলী ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫ নভেম্বর ২০২৬, ১১:০৮ AM ২৯ বার পঠিত
মানুষের মনের অন্ধকার দিক বাইরের পৃথিবীর চেয়েও জটিল: শফিক রিয়ান

ফাইল ছবি

কথাসাহিত্যিক শফিক রিয়ানের নতুন উপন্যাস ‘প্ররোচক’ মনস্তাত্ত্বিক রহস্য ও অপরাধ অনুসন্ধানের এক ভিন্নধর্মী আখ্যান। চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে তিন তরুণকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা, যা সংবাদমাধ্যমে ‘দ্য বার্নিং ট্রায়ো’ নামে পরিচিত, মূলত সেটিই এই উপন্যাসের কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু। আমেরিকাফেরত ইনভেস্টিগেটিভ সাইকোলজিস্ট ড. ইশরাক ও আরিফের অনুসন্ধানে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের রহস্য, জনতার উন্মত্ততা এবং পরিকল্পিত প্ররোচনার মনস্তত্ত্ব। এখানে শুধু অপরাধী শনাক্তকরণ নয় বরং মানুষ কীভাবে গুজব, ঘৃণা ও অন্যের প্রভাবে বিবেক হারিয়ে ভয়াবহ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, সেই প্রশ্নও গুরুত্ব পেয়েছে। নবকথন প্রকাশনী থেকে আগামী মাসে প্রকাশিতব্য লক্ষাধিক শব্দের এই উপন্যাসের প্রচ্ছদ করেছেন পরাগ ওয়াহিদ। উপন্যাসটি নিয়ে নেটওয়ার্ক নিউজ বিডির সঙ্গে কথা বলেছেন লেখক শফিক রিয়ান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহিবুল হাসান রাফি।

মুহিবুল হাসান রাফি: আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন?

শফিক রিয়ান: ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে পেরে ভালো লাগছে। আশা করি পাঠকদের সঙ্গেও এই আলাপের মধ্য দিয়ে আমার লেখালেখি এবং নতুন বই প্ররোচক নিয়ে কিছু ভাবনা ভাগ করে নিতে পারব।

মুহিবুল হাসান রাফি: আপনার লেখালেখির শুরুটা কীভাবে হলো?

শফিক রিয়ান: লেখালেখির শুরুটা খুব পরিকল্পিতভাবে হয়নি। বরং মানুষের জীবন, চারপাশের ঘটনা, সম্পর্কের জটিলতা, আনন্দ বেদনা এবং সমাজের নানা অসংগতি আমাকে ক্রমাগত ভাবিয়েছে। কিছু অনুভূতি, কিছু প্রশ্ন কিংবা কিছু ঘটনা মনের মধ্যে জমে থাকত। একসময় উপলব্ধি করি সেগুলো শুধু নিজের মধ্যে আটকে না রেখে শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করা প্রয়োজন। আমার কাছে লেখালেখি নিছক গল্প বলার মাধ্যম নয় এটি চিন্তা, অনুভূতি ও উপলব্ধিকে ভাষা দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। নিজের দেখা পৃথিবীকে নতুনভাবে বুঝতে এবং সেই উপলব্ধি অন্যের কাছে পৌঁছে দিতেই লেখালেখির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে সেই আগ্রহ নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে। বলতে গেলে জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও অমীমাংসিত প্রশ্নই আমাকে লেখক হওয়ার পথে এগিয়ে নিয়েছে।

মুহিবুল হাসান রাফি: লেখক হিসেবে এই লেখালেখির জীবন কেমন উপভোগ করেন?

শফিক রিয়ান: লেখালেখির জীবন আমার কাছে একই সঙ্গে আনন্দের, অনুসন্ধানের এবং একধরনের নিঃসঙ্গতার। একটি গল্প নির্মাণ করতে গিয়ে শুধু ঘটনার বিন্যাস করলেই হয় না চরিত্রগুলোর মনোজগতে প্রবেশ করতে হয়। তাদের আনন্দ, ভয়, দ্বিধা, অপরাধবোধ ও মানসিক টানাপোড়েন উপলব্ধি করতে হয়। কখনো একটি চরিত্রের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়, কখনো একটি দৃশ্য কিংবা একটি বাক্যের যথার্থতা খুঁজতে অনেকটা সময় ব্যয় করতে হয়। এই নির্মাণপ্রক্রিয়াই আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয়। লেখালেখির মধ্য দিয়ে অন্য মানুষের জীবন, চিন্তা ও অনুভূতিকে বোঝার সুযোগ পাই। একই সঙ্গে নিজের অজানা দিকগুলোর সঙ্গেও পরিচিত হই। একটি চরিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে কখনো নিজের ভেতরের এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, যেগুলো আগে কখনো ভাবিনি। তাই লেখালেখি আমার কাছে কেবল পেশা কিংবা শখ নয় এটি মানুষকে বোঝা এবং নিজেকে আবিষ্কারের এক নিরন্তর যাত্রা।

মুহিবুল হাসান রাফি: সাহিত্যের এত শাখা থাকতে হুট করে থ্রিলার ধারায় আসার কারণ কী?

শফিক রিয়ান: সাহিত্যের প্রতিটি শাখারই নিজস্ব সৌন্দর্য ও আবেদন রয়েছে। তবে থ্রিলারের প্রতি আমার বিশেষ আকর্ষণ মানুষের মনস্তত্ত্বকে ঘিরে। বিশেষ করে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার আমাকে বেশি টানে। কারণ মানুষের মনের ভেতর এমন অনেক রহস্য লুকিয়ে থাকে যা বাহ্যিক আচরণ দেখে সহজে বোঝা যায় না। মানুষ কেন ভয় পায়, কেন লোভের কাছে পরাজিত হয়, কীভাবে প্রতিশোধ কিংবা ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা তার চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে কিংবা একজন মানুষ কীভাবে অন্যের সিদ্ধান্ত ও বিশ্বাসকে প্রভাবিত করে এসব প্রশ্ন আমাকে ভাবায়। আমার মনে হয় মানুষের মনের অন্ধকার দিকগুলো অনেক সময় বাইরের পৃথিবীর অন্ধকারের চেয়েও জটিল ও রহস্যময়। থ্রিলারের মাধ্যমে সেই অদৃশ্য জগৎ অনুসন্ধানের সুযোগ পাওয়া যায়। আমি পাঠককে শুধু রহস্যের সমাধান খোঁজার মধ্যে আটকে রাখতে চাই না বরং গল্পের পরিণতিতে এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি করতে চাই যেগুলো পাঠ শেষ হওয়ার পরও তাঁর চিন্তায় থেকে যাবে।

মুহিবুল হাসান রাফি: প্রতিটি বইয়ের নামকরণের পেছনেই একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকে। আপনার বইয়ের নাম ‘প্ররোচক’ দেওয়ার কারণ কী?

শফিক রিয়ান: প্ররোচক শব্দটির মধ্যেই উপন্যাসের মূল দর্শন অনেকটা নিহিত রয়েছে। সাধারণ অর্থে প্ররোচক বলতে এমন কাউকে বোঝায় যে অন্য কাউকে কোনো কাজ করতে উৎসাহিত বা প্রভাবিত করে। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে ভয়ংকর প্ররোচক সে নয় যে প্রকাশ্যে কাউকে কোনো নির্দেশ দেয় বরং সে যে অন্যের মনের মধ্যে নিজের উদ্দেশ্যকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করে যে মানুষটি শেষ পর্যন্ত নিজের ইচ্ছাকেই নিজের সিদ্ধান্ত বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। একজন মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস কিংবা আবেগকে অন্য কেউ কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে এই প্রশ্ন উপন্যাসটির অন্যতম কেন্দ্রীয় ভাবনা। এখানে প্ররোচনা শুধু কোনো কাজের দিকে ঠেলে দেওয়ার বিষয় নয় এটি মানুষের বিবেক, বিচারবোধ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করার একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। সেই বিবেচনা থেকেই প্ররোচক নামটি বেছে নেওয়া।

মুহিবুল হাসান রাফি: প্ররোচক নিয়ে পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলুন।

শফিক রিয়ান: প্ররোচক আমার প্রথম থ্রিলার উপন্যাস। এটি মূলত একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার যেখানে রহস্য, অপরাধ ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে একই আখ্যানের ভেতর তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় ঘটনা দ্য বার্নিং ট্রায়ো। চট্টগ্রামে তিন তরুণকে গণপিটুনির পর পুড়িয়ে হত্যার ভয়াবহ ঘটনা থেকেই গল্পের সূত্রপাত। এর তদন্তে যুক্ত হন অনুসন্ধানী মনোবিজ্ঞানী ড. ইশরাক। কিন্তু অনুসন্ধান যত এগোয় ততই সামনে আসতে থাকে মানুষের বিশ্বাস, আবেগ, গুজব, সামাজিক প্রভাব এবং মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণের জটিল সব দিক। আমি শুধু তিনটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য তুলে ধরতে চাইনি। বরং জানতে চেয়েছি একটি মানুষ কীভাবে জনতার অংশ হয়ে নিজের বিচারবোধ হারিয়ে ফেলতে পারে, কীভাবে একটি গুজব কিংবা পরিকল্পিত প্ররোচনা অসংখ্য মানুষকে ভয়াবহ অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আর কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পেছনে যারা সরাসরি অংশ নেয় তাদের বাইরেও কি অন্য কারও দায় থাকতে পারে? আমার প্রত্যাশা পাঠক প্ররোচক পড়তে গিয়ে শুধু একটি রহস্যের সমাধান খুঁজবেন না বরং মানুষের মনস্তত্ত্ব, সামাজিক আচরণ এবং অপরাধের নেপথ্যে থাকা প্রভাব বিস্তারের প্রক্রিয়া নিয়েও ভাববেন। বইটি পড়ার পর যদি তাঁর মনে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি হয়, যদি পরিচিত সমাজ ও মানুষের আচরণকে নতুন করে বিশ্লেষণ করতে ইচ্ছা করে তাহলেই লেখার উদ্দেশ্য অনেকটাই সার্থক হবে।

মুহিবুল হাসান রাফি: ‘দ্য বার্নিং ট্রায়ো’ ঘটনাটি যদি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করতেন।

শফিক রিয়ান: দ্য বার্নিং ট্রায়ো উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এতে তিন তরুণকে গণপিটুনির পর পুড়িয়ে হত্যার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তবে আমার কাছে এটি শুধু একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নয় বরং জনতার মনস্তত্ত্ব, গুজবের বিস্তার, সামাজিক প্রভাব এবং মানুষের বিচারবোধ হারিয়ে ফেলার বিপজ্জনক প্রবণতার প্রতিফলন। আমরা অনেক সময় কোনো ঘটনা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ সত্য না জেনেই অন্যের বক্তব্যে প্রভাবিত হই। আবেগ, ক্ষোভ কিংবা গুজবের বশবর্তী হয়ে এমন সিদ্ধান্ত নিই যার পরিণতি আর ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। দ্য বার্নিং ট্রায়ো সেই বিপজ্জনক বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে। ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দিক হলো একটি জনতা কীভাবে তৈরি হয় এবং কীভাবে কিছু মানুষের চিন্তা, উদ্দেশ্য ও প্রভাব একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ব্যক্তির বিবেক ও বিচারবোধ কীভাবে সমষ্টিগত উন্মত্ততার কাছে পরাজিত হয় সেই প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধানের মধ্য দিয়েই উপন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক রহস্যের জগৎ উন্মোচিত হয়েছে।

মুহিবুল হাসান রাফি: যাঁরা লেখালেখি করেন কিংবা করতে চান, তাঁদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

শফিক রিয়ান: যাঁরা লেখালেখি করেন কিংবা লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তাঁদের প্রতি আমার প্রথম পরামর্শ নিয়মিত লিখুন এবং প্রচুর পড়ুন। লেখালেখিতে প্রতিভার গুরুত্ব রয়েছে তবে নিয়মিত চর্চা, অধ্যবসায় ও পর্যবেক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। অন্যের লেখার সঙ্গে নিজের লেখার তুলনা না করে নিজস্ব ভাষা ও স্বতন্ত্র লেখনশৈলী গড়ে তোলার চেষ্টা করা উচিত। চারপাশের মানুষকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। তাঁদের কথা শুনুন, আচরণ, অনুভূতি ও চিন্তার ধরন বোঝার চেষ্টা করুন। কারণ গল্পের সবচেয়ে বড় উপাদান মানুষ। মানুষকে যত গভীরভাবে বোঝা সম্ভব একজন লেখকের সৃষ্টিও তত বেশি বিশ্বাসযোগ্য ও জীবন্ত হয়ে ওঠে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শুধু লেখার জন্য লিখবেন না বলার মতো কিছু আছে বলেই লিখবেন। জনপ্রিয়তা কিংবা প্রশংসার প্রত্যাশার চেয়ে নিজের লেখার প্রতি সৎ থাকা বেশি জরুরি। একটি লেখা হয়তো পুরো পৃথিবী বদলে দিতে পারবে না কিন্তু একজন মানুষের চিন্তায় সামান্য পরিবর্তন আনতে পারলেও সেটি একজন লেখকের জন্য বড় প্রাপ্তি। আমার বিশ্বাস লেখকের প্রকৃত সার্থকতা শুধু কতজন তাঁর লেখা পড়লেন সেখানে নয় বরং তাঁর লেখা পাঠকের মনে কতটা গভীর ছাপ ফেলতে পারল সেখানেই।

মুহিবুল হাসান রাফি: ব্যস্ততার মাঝে সময় বের করে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।

শফিক রিয়ান: আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ আমাকে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

শুভ্র/

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!