শিরোনাম:
Network News BD
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

মেট্রোরেলে দাঁড়িয়ে থাকা প্রবীণ যাত্রীর মৃত্যু এবং আমাদের শিষ্টাচারের দায়!

রুশাইদ আহমেদ

রুশাইদ আহমেদ

প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ৫:২৮ PM ২০ বার পঠিত
মেট্রোরেলে দাঁড়িয়ে থাকা প্রবীণ যাত্রীর মৃত্যু এবং আমাদের শিষ্টাচারের দায়!

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি সম্পাদিত

রুশাইদ আহমেদ:

গত ২৪ অক্টোবর বিকালে রাজধানীর মেট্রোরেলে ভ্রমণের সময় হঠাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ড. নজীবুর রহমান নামের এক প্রবীণ যাত্রী। পূজার ছুটি শেষে অফিস-আদালত সব খোলার কারণে মেট্রোতে ব্যাপক ভিড় ছিল সেদিন। শাহবাগ স্টেশন থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে ৬৪ বছর বয়সী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের এই সহযোগী অধ্যাপক তাই দাঁড়িয়েছিলেন গণপরিবহনটির হাতল ধরে।

মেট্রোরেলটি শেওড়াপাড়া স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছালে তিনি অন্যান্য যাত্রীদের ঠেলাঠেলিতে অসুস্থ বোধ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে বয়স্ক ব্যক্তি, অন্তঃসত্ত্বা নারী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি ও কোলে সন্তান থাকা নারীদের জন্য নির্ধারিত প্রায়োরিটি সিটে (অগ্রাধিকার আসন) বসতে দেওয়ার জন্য নজীবুর অন্যান্য যাত্রীদের অনুরোধ জানালেও তাঁরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তিনি মেঝেতে পড়ে গিয়ে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

এ খবর আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং মৌলিক শিষ্টাচারের আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোর দিকে আঙুল তোলে। একইসঙ্গে মানবতাবোধ, বিবেক, সাধারণ বিচারবুদ্ধি এবং মানুষ হিসেবে একে অপরের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও দায়িত্বের ক্ষেত্রটিকেও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

আজকের আধুনিক দুনিয়ায় আমরা ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে পড়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছি। আর ঢাকার মতো দেশ-বিদেশের ব্যস্ত শহরগুলোতে সেই যান্ত্রিক বনে যাওয়ার প্রবণতা যেন পৌঁছেছে আরও উঁচুতে। জীবিকার তাগিদ, ব্যক্তিগত জীবনের ব্যস্ততা, প্রযুক্তিতে মগ্নতা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েনসহ নানা আর্থসামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভারে আমাদের হৃদয় আজ নিমজ্জিত৷ তবু, সেসবকে ছাপিয়ে সামাজিক শৃঙ্খলা এবং কল্যাণকর বসবাসযোগ্য পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখার তাগিদে আমাদের বিচারবুদ্ধি, মানবতাবোধ ও নৈতিক শিষ্টাচারের মৌলিক দিকগুলো হতে বিচ্যুত হওয়ার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না।

বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশেই মেট্রোরেলের মতো গণপরিবহন ব্যবস্থায় প্রায়োরিটি সিটের প্রচলন আছে। জাপান, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে এসব আসনে নির্দেশিত ব্যক্তিবর্গ ব্যতীত অন্য কেউ সচরাচর বসেন না। ফাঁকা থাকার ভিত্তিতে কখনো কখনো বসলেও সংশ্লিষ্ট যাত্রীরা পরিবহনে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অন্যরা নিজেদের নৈতিকতা ও মৌলিক শিষ্টাচারের জায়গা থেকে সেই আসনগুলো ছেড়ে দেন। এর জন্য সেখানকার পরিবহনগুলোতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দরকার পড়ে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

এছাড়া, সকল দেশেই মেট্রোরেলের মতো গণপরিবহনগুলো স্বল্প সময়ে অধিক দূরত্ব অতিক্রমের জন্য প্রসিদ্ধ। এ কারণেই এতে বসার আসন সংখ্যা সীমিত রাখা হয় অধিক যাত্রী ধারণক্ষমতার বিষয়টি মাথায় রেখে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। মেট্রোরেলে ঢাকার উত্তরা থেকে মতিঝিল যেতে সময় লাগে মাত্র ৩১-৩২ মিনিট। এ সময়ের মধ্যে ২০ কিলোমিটারেরও বেশি এই যাত্রাপথটুকু অনায়াসে দাঁড়িয়েই অতিক্রম করা তরুণ এবং সুস্থ মধ্যবয়সী ব্যক্তিদের জন্য খুব বেশি কষ্টকর হওয়ার কথা নয়।

কিন্তু, বাস্তবের দৃশ্যপটটা আলাদা। প্রায়শই মেট্রোরেলের প্রায়োরিটি সিটগুলো থাকে সুস্থ তরুণ ও কর্মঠ মধ্যবয়সীদের দখলে। আর পাশেই ভিড়ের ভেতরে গর্ভবতী নারী, জ্যেষ্ঠ নাগরিক, অসুস্থ যাত্রী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা দাঁড়িয়ে থাকেন। অথচ, আমাদের দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় হতেই নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং সাধারণ বিচারবুদ্ধির সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নানা পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হয়। এই পর্যায়ে এসে তাই প্রশ্ন উঠছে, জীবনে নৈতিক মূল্যবোধ আর মৌলিক শিষ্টাচার সম্পর্কিত জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিতে আমাদের কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

আমাদের মনে রাখতে হবে সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে সকল ধরনের আচরণ আর কর্মকাণ্ড আমাদের পারিবারিক শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতিচ্ছবি। ফলে, আমরা সমাজে বিস্তৃত পরিসরে যদি আমাদের মৌলিক ও সাধারণ বিচারবুদ্ধিকে কাজে না লাগিয়ে ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং নৈতিকতার অনুসরণ না করি, তবে আমাদের বসবাসের পরিবেশটা কল্যাণকর হয়ে উঠবে না। তাই শহুরে যান্ত্রিকতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতার শৃঙ্খল থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে আমাদের কাজ করার কোনো বিকল্প নেই।

এটি অবশ্য সত্যি যে, মেট্রোরেলে সেদিন ড. নজীবুর রহমানকে বসতে দিলে তিনি বেঁচে থাকতেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই৷ জীবন-মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার হাতে। এরপরও, সেসময়ে পরিবহনটির প্রায়োরিটি সিটে বসে থাকা ব্যক্তিরা যদি তখন আসন ছেড়ে দিতেন, তবে, হয়তো তিনি আরেকটু ভালোভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের ফুরসত পেতেন। বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সফল করেছে এদেশের নাগরিকরা, অন্তত সেদেশের জনসাধারণের কাছে আমরা এটুকু পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ পালনের বিষয়টি আশা করতে পারি। আর সেটি করা গেলেই আমাদের সমাজটা আরেকটু কল্যাণকর হয়ে উঠবে, যেখানে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বাঁধনে বাঁধা পড়ে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবেন স্ব স্ব নৈতিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন এবং বিবেকবোধের ন্যায়ভিত্তিক আবাদ নিশ্চিতের মাধ্যমে।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!