শিরোনাম:
Network News BD
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

কাশফুলের সাদা বিষাদ

শব্দশৈলী ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১২ PM ২৮ বার পঠিত
কাশফুলের সাদা বিষাদ

ছবি: এআই নির্মিত

ফারহানা মুনমুন:

আকাশজুড়ে সাদা মেঘের ভেলা। তার ফাঁক দিয়ে নরম রোদ এসে পড়েছে গ্রামের মেঠোপথে। দূরের কাশফুলগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। মনে হচ্ছে, প্রকৃতি যেন সাদা শাড়ি পরে কোথাও যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। চারপাশে শরতের নির্মল সৌন্দর্য, অথচ সেই সৌন্দর্যের মাঝেও কোথায় যেন এক অদৃশ্য বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে।

স্বপ্না জানালার পাশে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল উঠানের পাশের বড় শিউলি গাছটির দিকে। গাছটি সাদা সাদা ফুলে ভরে গেছে। বাতাসের সঙ্গে নেচে নেচে শিউলি ফুলগুলো ঝরে পড়ছে মাটিতে।

স্বপ্না অনেক দিন পর বাড়িতে এসেছে। শহরের ব্যস্ত জীবন, ক্লাস, পড়াশোনা আর প্রতিদিনের নানা দায়িত্বের মধ্যে প্রকৃতির সঙ্গে তার দূরত্ব যেন ধীরে ধীরে বেড়ে গিয়েছিল। শহরের কোলাহল আর যান্ত্রিকতার ভিড়ে কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছিল নিজের সেই সহজ-সরল স্বভাবটাকে। অথচ গ্রামে আসার পর থেকে তার মনে হচ্ছে, বহুদিন পর সে যেন নিজেকেই আবার খুঁজে পেয়েছে। মাটির গন্ধ, পাখির ডাক, পুকুরের জল আর শরতের আকাশ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে তার শৈশবের কাছে।

চায়ের কাপটা রেখে স্বপ্না বাইরে বেরিয়ে এলো। শিউলি গাছের নিচ থেকে কয়েকটি ফুল তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে পুকুরপাড়ে গিয়ে বসল।

পুকুরের পানিতে নীল আকাশের ছায়া। দূরে কয়েকটি পাখি উড়ে যাচ্ছে। চারপাশের নীরবতা হঠাৎ স্বপ্নাকে নিয়ে গেল বহু বছর আগের এক শরতের বিকেলে।

বাবা মারা গেছেন আজ চার বছর।

এই শরৎকালেই বাবার সঙ্গে কত শত স্মৃতি জমে আছে তার! স্মৃতিগুলো মনে পড়তেই স্বপ্নার বুকটা হু হু করে উঠল। চোখের কোণে জমে উঠল অশ্রু।

স্বপ্না ছিল বাবার বড্ড আদরের মেয়ে।

প্রতিদিন বিকেলে ছোট্ট স্বপ্না বাবার হাত ধরে বাজারে যেত। একদিন এমনই এক বিকেলে বাজারে যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে বিশাল কাশবন দেখে স্বপ্না হঠাৎ বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “বাবা, রাস্তার পাশে এই সাদা সাদা জিনিসগুলো কী? তুলা নাকি মেঘ?”

বাবা হেসে বলেছিলেন, “না, এগুলো তুলা কিংবা মেঘ নয়।”

স্বপ্না আবার জানতে চেয়েছিল, “তাহলে এগুলোকে কী বলে, বাবা?”

বাবা মায়াভরা কণ্ঠে বলেছিলেন, “এগুলোকে কাশফুল বলে।”

বাবা হয়তো আরও কিছু বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই ছোট্ট স্বপ্না বাবার হাত ছেড়ে কাশবনের দিকে দৌড়ে গেল। কাশফুলের মাঝে ছুটতে লাগল, কখনো ডানে, কখনো বামে। দু-একটি কাশফুল ছিঁড়ে হাতে নিল।

বাবা দূরে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে তাঁর ছোট্ট মেয়ের দুষ্টুমি দেখছিলেন।

কিছুক্ষণ পর স্বপ্না একটি কাশফুল নিয়ে বাবার হাতে দিয়ে বলেছিল, “বাবা, তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো বাবা। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।”

বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর তার মাথায় হাত রেখে মৃদু হেসেছিলেন।

সেদিনের সেই হাসিটা আজও স্বপ্নার চোখে ভাসে।

তারপর তারা দুজন বাজারের দিকে চলে গিয়েছিল। ছোট্ট স্বপ্না বাবার হাত শক্ত করে ধরে হাঁটছিল। শরতের বাতাসে কাশফুলগুলো তখনও দুলছিল।

এভাবেই শরতের বিকেলগুলো কেটে যেত। কাশফুল, বাবার হাত আর ছোট্ট ছোট্ট আনন্দে ভরে থাকত স্বপ্নার পৃথিবী।

কিন্তু সময় তো কখনো থেমে থাকে না।

একদিন শরৎ শেষ হয়ে গেল। পরেরবার মাঠে গিয়ে স্বপ্না দেখল চারপাশ ফাঁকা। কোথাও কোনো কাশফুল নেই। ছোট্ট স্বপ্না তখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। মেয়ের কান্না দেখে বাবা ভীষণ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন।

তখনও সে জানত না, জীবনের কোনো কোনো শূন্যতা একদিন চাইলেও আর পূরণ করা যায় না।

আজ স্বপ্না অনেক বড় হয়েছে। শরৎ আসে, শরৎ চলে যায়। কিন্তু বাবা আর আসেন না।

চার দিন হলো স্বপ্না গ্রামে এসেছে। মাঠজুড়ে কাশফুল, উঠানজুড়ে শিউলি। প্রকৃতি যেন আগের মতোই সেজেছে। অথচ এসবের প্রতি তার আর আগের মতো কোনো আগ্রহ নেই।

কারণ, প্রকৃতি বাবার শূন্যতা অনুভব করতে না পারলেও স্বপ্না ঠিকই পারে।

মাঠভরা কাশফুল আর উঠানভরা শিউলি তার মনের শূন্যতা পূরণ করতে পারে না। তার কল্পনায় বারবার শুধু একটি দৃশ্যই ফিরে আসে: এক শরতের বিকেলে সে বাবার হাত ধরে কাশবনের পাশ দিয়ে হাঁটছে। বাবা কাশবন থেকে একটি ফুল ছিঁড়ে তার হাতে দিচ্ছেন। আর ছোট্ট স্বপ্না সেই ফুল হাতে নিয়ে মনের আনন্দে ছুটে বেড়াচ্ছে।

স্বপ্না চোখ মুছে আকাশের দিকে তাকাল। সাদা মেঘগুলো ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছে। হঠাৎ একটা শিউলি ফুল এসে তার পাশে পড়ল।

স্বপ্না ফুলটি হাতে তুলে নিল।

মনে হলো, বাবা যেন আজও তাকে কোনো এক শরতের বিকেলে কাশফুল হাতে দিয়ে বলছেন, “ভয় পাস না, আমি তো আছি।”

কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম।

বাবা নেই। শুধু রয়ে গেছে তাঁর স্মৃতি।

স্বপ্না মুঠোয় শিউলি ফুলগুলো শক্ত করে ধরে মৃদু স্বরে বলল, “বাবা, শরৎ আবার এসেছে। শুধু তুমি আসোনি।”

তার চোখ বেয়ে নেমে এল কয়েক ফোঁটা অশ্রু।

দূরের কাশবন তখনও বাতাসে দুলছিল। শিউলি ফুল ঝরছিল একের পর এক। প্রকৃতি তার নিয়মে শরৎকে বরণ করছিল।

শুধু স্বপ্নার কাছে সেই শরৎ আর আগের মতো ছিল না।

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!