বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে গ্রামীণ নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু তাঁদের এই নীরব অবদান ও এগিয়ে যাওয়ার পথে আজও বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নানা সামাজিক কুসংস্কার, অবহেলা ও বৈষম্য। গ্রামীণ নারীদের স্বপ্ন, কৃষিতে তাঁদের শ্রমের স্বীকৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষমতায়ন নিয়ে নিজেদের ভাবনা তুলে ধরেছেন ইডেন মহিলা কলেজের একদল নারী শিক্ষার্থী।
গ্রামীণ নারীর স্বপ্ন বনাম সমাজের বেড়াজাল
– মাগফেরা আখতার, সমাজকর্ম বিভাগ
গ্রামের মেঠোপথ ধরে হেঁটে চলা প্রতিটি নারীর বুকেও লুকিয়ে থাকে একেকটি স্বপ্ন। কেউ হতে চান শিক্ষিকা, কেউ উদ্যোক্তা, আবার কেউ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে গড়তে চান নিজের পরিচয়। কিন্তু তাঁদের স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজের নানা বেড়াজাল। ‘মেয়েদের এত পড়াশোনা করে কী হবে’ এমন মানসিকতা আজও অনেক পরিবারে নারীর অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়। বাল্যবিবাহ, যৌতুকপ্রথা, পর্দার অপব্যাখ্যা, চলাফেরায় বিধিনিষেধ এবং লোকলজ্জার ভয় তাঁদের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে। পরিবারের সম্মান রক্ষার অজুহাতে অনেক মেয়ের মতামত উপেক্ষা করা হয়, বিসর্জন দিতে হয় নিজের ইচ্ছা ও সম্ভাবনা। কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার বাধা এবং নারীর উপার্জন নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও তাঁদের এগিয়ে চলাকে কঠিন করে তোলে। এই বেড়াজাল ভাঙতে প্রয়োজন সচেতনতা, শিক্ষার প্রসার, পারিবারিক সহযোগিতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। কারণ গ্রামীণ নারীর মুক্ত অগ্রযাত্রাই পারে সমাজকে আরও মানবিক, সমতাভিত্তিক ও সমৃদ্ধ করে তুলতে।
গ্রামীণ নারীর শ্রমের মূল্যায়ন কতটুকু?
– নাজিয়া তাবাসসুম, সমাজকর্ম বিভাগ
গ্রামীণ নারীরা দেশের অর্থনীতি ও কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁরা ফসল উৎপাদন, বীজ সংরক্ষণ, গবাদিপশু পালন, রান্না ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার মতো নানা কাজ করেন। কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগ কাজের জন্য কোনো মজুরি দেওয়া হয় না। প্রতিদিন অনেক পরিশ্রম করলেও তাঁদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নারীর অবৈতনিক শ্রমের বার্ষিক মূল্য প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের জিডিপির প্রায় ১৯ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবু অনেক নারী মজুরি বৈষম্য ও সামাজিক অবহেলার শিকার হন। তাঁদের শ্রমকে সম্মান জানানো এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সম্পদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামীণ নারীর শ্রমের সঠিক মূল্যায়ন হলে তাঁদের জীবনমান উন্নত হবে এবং দেশের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।
কৃষিতে নারীর অবদান, স্বীকৃতিতে কেন পিছিয়ে?
– আফরিদা ইসলাম, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
বাংলাদেশের কৃষিতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অবদানও কম কিছু নয়। বীজ সংরক্ষণ, বীজ তোলা, চারা রোপণ, ফসল সংগ্রহ, শস্য শুকানো ও সংরক্ষণসহ নানা কাজে নারীরা সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি গবাদিপশু পালন করেও নারীরা পরিবারে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তবুও তাঁদের শ্রম যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। নারীদের কৃষিকাজে অংশগ্রহণ করাকে পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়। ফলে তাঁদের শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন হয় না। অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিকানা, কৃষিঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হন। এতে কৃষিতে তাঁদের দক্ষতা ও সম্ভাবনা পূর্ণভাবে বিকশিত হতে পারে না। ফলে সামগ্রিক কৃষি উন্নয়ন সম্ভব হয় না। তাই নারীর শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন, ন্যায্য মজুরি, জমির অধিকার, প্রশিক্ষণ ও ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি কৃষিতে নারীদের অবদান সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। গ্রামীণ নারীরা শুধু কৃষকের সহকারী নন, তাঁরা কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাঁদের শ্রমের স্বীকৃতি ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হলেই কৃষিতে নারীর প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।
শিক্ষার আলো থেকে এখনো দূরে গ্রামীণ নারীরা
– মায়মুনা, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ
একটি মেয়ের হাতে বই তুলে দেওয়া সহজ, কিন্তু সেই বইয়ের জ্ঞান দিয়ে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করা আরও কঠিন। বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের শিক্ষার বাস্তবতা এই অসম্পূর্ণ অগ্রগতিরই প্রতিফলন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি অনুযায়ী, গ্রামীণ নারীদের সাক্ষরতার হার ২০১১ সালের ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ৬৯ দশমিক ৯৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য হলেও শহরের নারীদের সাক্ষরতার হার ছিল ৭৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রাম ও শহরের ব্যবধান ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ পয়েন্ট। তবে শুধু সাক্ষরতার পরিসংখ্যান দিয়ে শিক্ষার সব সক্ষমতা পরিমাপ করা যায় না। একজন নারী পড়তে ও লিখতে পারলেও ডিজিটাল সরকারি সেবা ব্যবহার, অনলাইন প্রতারণা শনাক্ত কিংবা আর্থিক নথির শর্ত বুঝতে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাব অনুভব করতে পারেন। এগুলো গ্রামীণ নারীদের মধ্যে কতটা বিস্তৃত, তা জানতে পৃথক গবেষণা প্রয়োজন। তাই শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি বা সাক্ষরতার হার নয়, শিক্ষার ব্যবহারিক ফলাফলও মূল্যায়ন করা জরুরি। প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং আর্থিক সাক্ষরতার সুযোগ বাড়াতে হবে। একজন নারী অক্ষর চিনতে শিখলেই শিক্ষার যাত্রা শেষ হয় না, সেই অক্ষর যখন তাঁকে নিজের অধিকার চিনতে শেখায়, তখনই শিক্ষার প্রকৃত অর্থ পূর্ণতা পায়। ।
গ্রামীণ নারীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে ক্ষুদ্র উদ্যোগের ভূমিকা
– জুহা, সমাজকর্ম বিভাগ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সমাজব্যবস্থায় গ্রামীণ নারীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, সামাজিক কুসংস্কার এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক গ্রামীণ নারী স্বাবলম্বী হতে পারেন না। গ্রামীণ নারীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে ক্ষুদ্র উদ্যোগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষুদ্র উদ্যোগ গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। তাঁরা ঘরে বসে অথবা নিজ এলাকায় বিভিন্ন উৎপাদনমূলক কাজের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে পারেন। ফলে তাঁদের বেকারত্ব কমে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়। ক্ষুদ্র উদ্যোগ নারীদের আয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনেও সাহায্য করে। এটি নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এবং সামাজিক মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। তবে গ্রামীণ নারীদের ক্ষুদ্র উদ্যোগ পরিচালনার ক্ষেত্রে মূলধনের অভাব, সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়া, প্রশিক্ষণের অভাব এবং সামাজিক বাধার মতো বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করার জন্য সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, কারিগরি ও ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ, বাজার সুবিধা বৃদ্ধি এবং সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। গ্রামীণ নারীদের ক্ষুদ্র উদ্যোগে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে নারীর ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ উন্নয়ন ও বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি আরও ত্বরান্বিত হবে।
গ্রামীণ নারীর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তায় অবহেলা
– নাসরিন আক্তার, সমাজকর্ম বিভাগ
নারী পরিবার ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কিন্তু গ্রামীণ সমাজে নারীরা প্রায়ই স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অবহেলার শিকার হন। বিশেষ করে মাতৃত্বকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় যত্নের অভাব এবং পর্যাপ্ত মাতৃসদন ও স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের সীমাবদ্ধতা তাঁদের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। এ ছাড়া পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতা, প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীনতা গ্রামীণ নারীদের অন্যতম সমস্যা। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও তাঁরা পারিবারিক সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, আইনি বিচারপ্রাপ্তিতে বাধা ও সাইবার অপরাধের শিকার হন। এসব সমস্যা সমাধানে ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। নারীদের পুষ্টি, প্রজনন স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগ এবং নারীর প্রতি সহিংসতার বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। নারীর স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সম্মিলিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ।
শুভ্র/
