ডিমের পুষ্টিগুণ, সহজলভ্যতা এবং খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে এর ভূমিকা তুলে ধরে আজ শুক্রবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডিম দিবস ২০২৬। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) ও ওয়ার্ল্ডস পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউপিএসএ) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
১৯৯৬ সালে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশনের (আইইসি) এক সম্মেলনে গৃহীত উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় প্রথমবার এই দিবস পালিত হয়। সেই হিসেবে এ বছর দিবসটির ৩০তম বার্ষিকী উদ্যাপিত হচ্ছে।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘প্রোটিন দ্যাট পাওয়ারস অ্যান্ড প্রটেক্টস’ অর্থাৎ যে প্রোটিন শক্তি জোগায় ও সুরক্ষা দেয়। এই প্রতিপাদ্যে পেশির বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং সুস্থ বার্ধক্যের জন্য ডিমের উচ্চমানের প্রোটিনের ভূমিকার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সব বয়সী মানুষের মধ্যে ডিমের পুষ্টি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে এবার ‘এগউইন’ নামের একটি মাসকটও আনা হয়েছে।
শুক্রবার পালিত হতে যাওয়া এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য হলো সাশ্রয়ী মূল্যের প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টির উৎস হিসেবে ডিমের প্রচার বাড়ানো। পাশাপাশি সব বয়সী মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এর গুরুত্ব তুলে ধরা, পোলট্রি খামারি ও এই শিল্পের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং ডিম খাওয়া নিয়ে সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো দূর করা।
ডিমের পুষ্টিগুণ
ডিমে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিন এবং কোলিন, আয়রন ও ভিটামিন বি-১২ এর মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান, যা পেশির বিকাশ, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা এবং সার্বিক সুস্বাস্থ্যে সহায়তা করে। ডিমের কুসুমে থাকা কোলিন মস্তিষ্কের বিকাশ ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া ডিমে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট লুটেইন ও জিয়াজেনথিন চোখের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সাহায্য করে।
সাশ্রয়ী ও বহুমুখী পুষ্টির উৎস হিসেবে ডিম বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। গরু বা খাসির মাংসের তুলনায় ডিম উৎপাদনে পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। ফলে টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ডিম প্রোটিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত। এ ছাড়া পোলট্রি খামারগুলো আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বড় অবদান রাখছে।
বাংলাদেশে ডিমের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) তথ্যমতে, বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ২ হাজার ৪৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডিম উৎপাদিত হয়। প্রতিদিনের উৎপাদন প্রায় ৬ কোটির বেশি। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু বার্ষিক ডিমের প্রাপ্যতা প্রায় ১৩৭টি। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বাড়িয়ে মাথাপিছু ২০০টিতে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছে।
তবে পোলট্রি ফিড, মুরগির বাচ্চা, ওষুধ ও জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে খামারিদের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে খামার ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। এতে চরম চাপের মুখে পড়ছেন ক্ষুদ্র উৎপাদকেরা।
অপুষ্টি দূর করা এবং শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত জাতীয় স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে ডিম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সপ্তাহে দুটি থেকে তিনটি করে ডিম দেওয়ার কথা রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ডিমের উৎপাদন ও ব্যবহার
সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৬১ হাজার ৭০০ কোটি ডিম উৎপাদন করে বিশ্বের শীর্ষ ডিম উৎপাদনকারী দেশ এখন চীন। অন্যদিকে মাথাপিছু ডিম খাওয়ার দিক থেকে এগিয়ে আছে মেক্সিকো। দেশটিতে বছরে মাথাপিছু গড়ে ৪০৯টি ডিম খাওয়া হয়। এরপরই রয়েছে জাপান, সেখানে মাথাপিছু বার্ষিক ডিম খাওয়ার পরিমাণ প্রায় ৩৩৭টি। অনেক উন্নত দেশে বার্ষিক মাথাপিছু ডিম গ্রহণের পরিমাণ ২৭০ থেকে ৩০০টির মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশের প্রাপ্যতা ও গ্রহণের হার এখনো তুলনামূলকভাবে কম।
দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি
বিশ্ব ডিম দিবস উপলক্ষে ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে যৌথভাবে নানা উদ্যোগ নিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ওয়ার্ল্ডস পোল্ট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের বাংলাদেশ শাখা এবং বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল।
বাংলাদেশে ‘ডিমে পুষ্টি, ডিমে শক্তি, ডিমে রোগমুক্তি’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে দেশব্যাপী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সচেতনতামূলক শোভাযাত্রা, সেমিনার ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া পুষ্টিকর খাবারের প্রাপ্যতা বাড়াতে ঢাকা শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সুবিধাবঞ্চিত শিশু, এতিমখানা এবং বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দাদের মধ্যে বিনা মূল্যে ডিম বিতরণ করা হবে। সুষম খাদ্যাভ্যাসে ডিমের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিতে পোলট্রি খামারি এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের অবদান তুলে ধরাই এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
