ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি। আর ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ আমাদের মাঝে ফিরে আসে ত্যাগের এক মহিমান্বিত বার্তা নিয়ে। কিন্তু প্রতি বছর ঈদ ঘনিয়ে আসলেই আমাদের চারপাশে এক নির্মম ও রূঢ় বাস্তবতা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। উৎসবের আলো ঝলমলে আবহের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় সমাজের অসহায়, দরিদ্র আর সুবিধাবঞ্চিত মানুষের করুণ মুখগুলো, যেখানে কোরবানির মূল উদ্দেশ্যই যেন কেবল লোক দেখানো হয়ে দাঁড়ায়।
আজ আমাদের সমাজের একশ্রেণীর মানুষের মাঝে কোরবানি দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যটাই যেন হারিয়ে গেছে। কার চেয়ে কার পশুর দাম বেশি, কার গরুটা কত বড়, তা নিয়ে চলে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সামাজিক মর্যাদা বাড়ানো আর লোক দেখানোর এই মানসিকতা কোরবানির পবিত্রতাকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করছে। যারা কেবল নিজের অহংকার প্রকাশের জন্য কোরবানি দিচ্ছেন, তারা ভুলে যান যে আল্লাহর দরবারে পশুর রক্ত বা মাংস পৌঁছায় না, পৌঁছায় কেবল বান্দার অন্তরের তাকওয়া ও নিয়ত।
ফ্রিজ ভর্তি মাংস বনাম দরিদ্রের হক
কোরবানির ঈদ আসার আগেই অনেক সচ্ছল পরিবারে তোড়জোড় শুরু হয় ফ্রিজ পরিষ্কার করার কিংবা আরও বড় ফ্রিজ ক্রয়ের। উদ্দেশ্য একটাই, কোরবানির মাংস দিয়ে ফ্রিজের প্রতিটি কোনা পূর্ণ করা। অথচ এই মাংসের ওপর সমাজের ক্ষুধার্ত, দরিদ্র ও অভাবী মানুষের হক রয়েছে। অনেক পরিবার লোক দেখানো কোরবানির পর সেই মাংসের সিংহভাগ নিজেরা রেখে দেন, আর লোকলজ্জা ঢাকতে অসহায়দের হাতে তুলে দেন নামমাত্র বা নিকৃষ্ট অংশটুকু। এই মানসিকতা অত্যন্ত নিন্দনীয়, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এই প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। যেখানে কোরবানি দেওয়ার মূল অর্থই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করা এবং চারপাশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, সেখানে ফ্রিজ ভর্তি করে সম্পদ কুক্ষিগত করার মাঝে কোরবানির কোনো সার্থকতা থাকতে পারে না।
সঠিক বণ্টনই হোক আমাদের মূল অঙ্গীকার
ইসলাম আমাদের কোরবানির মাংস বণ্টনের একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ম শিখিয়েছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোরবানির মাংসকে তিন ভাগে ভাগ করা উত্তম। এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং বাকি এক ভাগ সম্পূর্ণভাবে দরিদ্র ও অনাহারী মানুষের জন্য। কিন্তু আমাদের উচিত শুধু এই নিয়মের গণ্ডিতে আটকে না থেকে, চারপাশের প্রকৃত অভাবীদের খুঁজে বের করা। যারা লোকলজ্জার ভয়ে কারও কাছে হাত পাততে পারেন না, তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে সম্মানের সাথে এই মাংস পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
পশুর গলায় ছুরি চালালেই কোরবানি তো হয় না ভাই,
নিয়ত যদি হয় দেখানো আল্লাহর কাছে মূল্য নাই।
ফ্রিজ ভরা সেই মাংস দিয়ে নিজের খাঁচা ভরবে কত?
অসহায়দের ফিরিয়ে দিয়ে লোক ঠকাবে আর কত?
তিনটি ভাগের হকের বণ্টন সঠিক পথে করতে হবে,
অভাবী আর দরিদ্রদের প্রাপ্য তাদের দিতেই হবে।
ত্যাগের আলোয় মুছবে আঁধার ভাঙবে মনের অহংকার,
তবেই সফল কোরবানি আজ তবেই খুশি পরোয়ার।
কোরবানি কোনো উৎসবের মাংস খাওয়ার উপলক্ষ নয়, এটি আত্মত্যাগের এক অনন্য পরীক্ষা। লোক দেখানো মানসিকতা পরিহার করে আমাদের সঠিক পন্থা অবলম্বন করতে হবে। আসুন, এবার ঈদে আমরা ফ্রিজ ভরার প্রতিযোগিতায় না নেমে, সমাজের অসহায় মানুষের থালা পূর্ণ করার প্রতিযোগিতায় নামি। তবেই সার্থক হবে আমাদের কোরবানি, সমাজ ফিরে পাবে সাম্য আর মানবিকতার প্রকৃত রূপ।
