পরিবার কেবল একটি শব্দ নয়, বরং এক পরম নির্ভরতা আর প্রশান্তির নাম। দিনশেষে আমাদের সব ক্লান্তি, হতাশা আর না-পাওয়ার বেদনাগুলো যেখানে এসে জুড়িয়ে যায়, তা হলো পরিবার। প্রতি বছর ১৫ মে আমরা আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস পালন করি ঠিকই, কিন্তু আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত গড়ে ওঠে পরিবারের অদৃশ্য ছায়ায়। অসুখ-বিসুখ কিংবা মনের টানাপোড়েনে সবার আগে এই প্রিয় মুখগুলোই নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়ায়, আমাদের ক্লান্ত প্রাণে নতুন করে বাঁচার শক্তি আর অদম্য সাহস জোগায়। যান্ত্রিক এই যুগে পরিবার নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের ভাবনা কেমন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে এনেছেন কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী— সাব্বির হাসান নিরব।

মানসিক স্বাস্থ্যের ঢাল একটি সুন্দর পরিবার
আমাদের কর্মব্যস্ত জীবনে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মনের দিক থেকেও সুস্থ থাকা জরুরি। আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই নানা রকম চাপ থাকে। কারও কাজের চাপ, কারও আবার পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার নিয়ে। ফলে শরীর ভালো থাকলেও অনেক সময় আমরা ভেতর থেকে ভেঙে পড়ি। এমন সময়ে একটি সুন্দর পরিবার হতে পারে শান্তির পরম আশ্রয়স্থল। পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটালে মন ভালো থাকে। বিশেষ করে পারিবারিক আড্ডা সদস্যদের মধ্যকার বন্ধন দৃঢ় করে এবং হতাশা কমিয়ে প্রশান্তি জোগায়। আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ঢাল হিসেবে কাজ করে পারিবারিক কাঠামো। বাবা-মায়ের সাথে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক এবং ভাইবোনদের সাথে সুসম্পর্ক জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা আমাদের চাপ কমিয়ে ব্যক্তিগত জীবনকে আরও সুন্দর করে তোলে।
— নাঈমা ইসলাম, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ।
নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এক নিরাপদ বন্দর পরিবার
পৃথিবীতে মা-বাবাই একমাত্র মানুষ, যারা কোনো প্রাপ্তির আশা ছাড়াই সন্তানকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন। আমার পরিবারে মা-বাবার পাশাপাশি বড় বোন হলেন আমার সব আবদারের জায়গা। অনেকেই মাকে বেশি ভালোবাসার কথা বলেন, তবে আমার জীবনে বাবার অবদান ও প্রভাব সবচেয়ে বেশি। তিনি আমাদের বটগাছের ছায়ার মতো আগলে রাখেন। অন্যদিকে, মা হলেন আমার নির্ভয়ে কথা বলার আশ্রয়। পড়াশোনা থেকে শুরু করে কেনাকাটা বা ঘোরাঘুরি, সবক্ষেত্রেই বড় বোন তার মূল্যবান সময় দিয়ে আমাকে আগলে রেখেছেন। মা-বাবার কর্মব্যস্ততার মাঝে বোনের শাসন আর ভালোবাসাই আমার বড় শক্তি। অসুস্থতায় তাদের সেবা আর ছুটির দিনে মায়ের হাতের রান্নায় কাটানো মুহূর্তগুলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। শত রাগ আর অভিমান শেষে এই পরিবারই আমার একমাত্র নিরাপদ বন্দর।
— শেখ মাহফুজা তমা, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ।

শিকড়ের টান: একক বনাম যৌথ পরিবার
একক ও যৌথ পরিবার দুটি ভিন্ন জীবনধারা হলেও এদের অনুভূতির কেন্দ্রবিন্দুতে মিশে আছে আপনজন শব্দটি। একক পরিবারে ব্যক্তিস্বাধীনতা, নিজস্ব গোপনীয়তা ও নিজেদের মতো করে স্বপ্ন গড়ার অবারিত সুযোগ থাকে। অন্যদিকে যৌথ পরিবার হলো আবেগ, ঐতিহ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক জীবন্ত ক্যানভাস। যৌথ পরিবারের প্রতিটি সদস্য একে অপরের সুখে-দুঃখে অকৃত্রিম শক্তি হয়ে পাশে দাঁড়ায়। আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততা ও চাকচিক্য মানুষকে বর্তমানে ছোট পরিবারের দিকে ধাবিত করলেও যৌথ পরিবারের সেই মায়ার টান ও নিরাপদ আশ্রয়ের আবেদন আজও অমলিন। কারণ দিনশেষে মানুষ শুধু একটি কংক্রিটের ঘর চায় না, চায় হৃদয়ের গভীর উষ্ণতা ও নিঃশর্ত ভালোবাসা। পরিবার ছোট হোক বা বড়, পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা ও আত্মিক বন্ধনই একে পূর্ণতা দেয়। সম্পর্কের এই নিবিড় সংযোগই আমাদের জীবনকে অর্থবহ ও সুন্দর করে তোলে।
— মুস্তাকিম হাসান, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ।
পরিবারই আমাদের শিকড়
সমাজের সবচেয়ে প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হলো পরিবার। পরিবার থেকেই মানুষের জীবনযাত্রার সূচনা হয়। একটি শিশুর প্রথম শিক্ষা, প্রথম ভালোবাসা এবং প্রথম আশ্রয়স্থল হলো তার পরিবার। তাই পরিবারকে মানুষের জীবনের মূল ভিত্তি বলা হয়। একটি বৃক্ষ যেমন শিকড় ছাড়া বাঁচতে পারে না, তেমনি মানুষও পরিবার ছাড়া পরিপূর্ণ জীবন গঠন করতে পারে না। জীবনের নানা ঝড়, দুঃখ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পরিবার বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে আমাদের রক্ষা করে। পরিবার থেকেই আমরা সাহস, অনুপ্রেরণা ও মানসিক শক্তি লাভ করি। একটি সদ্যজন্মানো শিশু জানে না সে কী করবে বা কোথায় যাবে। পরিবারই তাকে ধীরে ধীরে কথা বলা, চলাফেরা, শিষ্টাচার ও নৈতিক শিক্ষা শেখায়। তাই একজন মানুষের প্রধান পরিচয় তার পরিবার। পরিবারেই সে বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করে এবং মানবিক মূল্যবোধ অর্জন করে। এ কারণেই বলা হয় পরিবার মানুষের আসল শিকড়।
— সোনিয়া আক্তার, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ।
পরিবার হলো আদি ও অকৃত্রিম পাঠশালা
পরিবার আমাদের আদি ও অকৃত্রিম পাঠশালা। মানুষ পরিবারেই জন্ম নেয়, বেড়ে ওঠে এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু শিখছে, আর এই শিক্ষার মূল ভিত্তি বা হাতেখড়ি হয় পরিবার থেকেই। সামাজিকতা, সহমর্মিতা, ধৈর্য এবং ন্যায়পরায়ণতার মতো নৈতিক গুণগুলো একটি শিশু তার পরিবার থেকেই শেখে। মানুষ জীবনে যে অবস্থানেই যাক না কেন, পারিবারিক শিক্ষার গুরুত্ব সবকিছুর উপরে। সমাজের কোন কাজগুলো ভালো আর কোনগুলো অন্যায়, এই মূল্যবোধগুলো পরিবারই আমাদের মধ্যে গেঁথে দেয়। সামাজিক ও ধর্মীয় আদর্শ মেনে একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে পরিবারের ভূমিকাই প্রধান। একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধই মূলত সমাজের প্রতি আমাদের দায়িত্বশীল করে তোলে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সামাজিকীকরণের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই আমরা জীবনের শ্রেষ্ঠ পাঠগুলো পাই। সর্বোপরি বলতে গেলে, পরিবারই আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ পাঠশালা।
— বন্যা রানী বৈষ্ণব, সরকারি মহিলা কলেজ, কিশোরগঞ্জ।

পরিবার: এক পরম নির্ভরতার নাম
পরিবার শব্দটি ছোট হলেও এর গভীরতা অসীম। পৃথিবীর অধিকাংশ সম্পর্ক যখন স্বার্থের টানে রং বদলায়, তখন পরিবারের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা থাকে ধ্রুবতারার মতো অটল। শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি বাঁকে পরিবার অদৃশ্য সুতোর মতো আমাদের আগলে রাখে। এটি কেবল রক্তের সম্পর্কের কোনো কাঠামো নয়, বরং এক পরম নির্ভরতার নিরাপদ আশ্রয়। পরিবারের শক্তি এতটাই প্রবল যে, এখানে আমাদের প্রতিটি পরাজয় খুঁজে পায় সান্ত্বনার পরশ আর প্রতিটি ছোট জয় পায় পূর্ণতা। যান্ত্রিক এই পৃথিবীতে যখন সবকিছু লেনদেন আর শর্তের ওপর ভিত্তি করে চলে, তখন পরিবারই একমাত্র জায়গা যেখানে ভালোবাসা কোনো ব্যাকরণ মানে না। মানসিক অবসাদের তপ্ত মরুভূমিতে পরিবারের সদস্যদের একেকটি হাসিমাখা মুখ যেন এক পশলা প্রশান্তির বৃষ্টি, যা নিমিষেই জীবনের সব ক্লান্তি ও গ্লানি ধুয়ে দেয় এবং নতুন করে বাঁচার শক্তি জোগায়। জীবনের আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত এই নিঃস্বার্থ সমীকরণই আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান শক্তি।
— আজিজুল হাকিম, হাজী আসমত সরকারি কলেজ, ভৈরব।
