শিরোনাম:
Network News BD
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

পদ্মানদীর মাঝি: আদিম প্রবৃত্তি ও শ্রেণি সংগ্রামের দহন

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশিত: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১১:২০ PM ৭ বার পঠিত
পদ্মানদীর মাঝি: আদিম প্রবৃত্তি ও শ্রেণি সংগ্রামের দহন

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

সুলতান শরীফ উদ্দিন মাহমুদ

সমাজ ও মানুষের রূঢ় ও নিষ্ঠুর সত্যকে সবরকমের আড়াল থেকে মুক্ত করে নিরাবেগ নিষ্ঠায় প্রকাশ করা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬) এর সৃষ্টিশক্তির মূল প্রেরণা। তাঁর ‘পদ্মানদীর মাঝি’ (১৯৩৬) উপন্যাসে অন্তহীন প্রাণের বহুমুখী বিস্তার উপন্যাসটিকে দিয়েছে বহুমাত্রিক আবেদন যাতে রয়েছে ফ্র‍য়েডীয় ও মার্ক্সীয় তত্ত্বের মিশেল।

“ঐ নৌকাটি ধনঞ্জয়ের সম্পত্তি। জালটাও তারই। প্রতি রাত্রে যত মাছ ধরা হয় তার অর্ধেক ভাগ ধনঞ্জয়ের, বাকি অর্ধেক কুবের ও গণেশের।” উপন্যাসের প্রথম পাতার এই দৃশ্যটি পুঁজিবাদের আদি পাঠ। ‘পুঁজি বেশি শ্রম কম, পুঁজি কম শ্রম বেশি’ যার মূল মন্ত্র। জেলে পাড়ার বেশির ভাগ মাঝিরই নৌকো নেই, জাল নেই। ধনঞ্জয় মাঝি হলেও পুঁজির প্রতিনিধি; কারণ নৌকোটা তার।  নৌকো ও জালের মালিকেরা সাধারণ জেলেদের নানা কৌশলে ঠকায়, শোষণ আর বঞ্চনাই যেন তাদের নিয়তি।

হোসেন মিয়ার ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত ধীর ও গভীর। তার ভেতরে এক প্রকার ‘গড কমপ্লেক্স’ দেখা যায়। সে মানুষের অভাবকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের ভাগ্যবিধাতা হতে চায়। তার এই ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা বা ‘Will to Power’ তাকে অন্যান্য সাধারণ চরিত্র থেকে আলাদা করে। হোসেন মিয়া পুঁজিবাদের প্রতিনিধি, সামন্ত প্রভু। কোন অবস্থাতেই মানিকের আদর্শে গড়া চরিত্র নয়! অথচ মানিক তাঁর ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটালেন হোসেন মিয়ার মধ্য দিয়েই! ময়নাদ্বীপ ‘হোসেন মিয়া’র এক ইউটোপিয়া। যার মিল আছে মার্ক্সীয় আদিম সাম্যবাদী সমাজের সাথে। যেই ময়নাদ্বীপে কোনো শ্রেণি বৈষম্য থাকবে না। ধর্মের বিভেদ থাকবে না। সেখানে মুসলমানের মসজিদ কিংবা হিন্দুদের মন্দির কোনোটাই সে রাখবে না। আসলে এই ময়নাদ্বীপ হোসেন মিয়ার শোষণমুক্ত সমাজ ভাবনার প্রতিফলন। এখানে মানিক মার্ক্সীয়।

মার্ক্সীয় তত্ত্বে ‘উৎপাদন যন্ত্রের’ মালিকানা যার হাতে, ক্ষমতা তার। উপন্যাসের চরিত্র ‘কুবের’ একজন শোষিত সর্বহারা (Proletariat)।  কুবেরের নিজের নৌকা নেই, জাল নেই। সে হোসেন মিয়ার মতো পুঁজিদাতার দয়ার ওপর নির্ভরশীল। তার দারিদ্র্যই তাকে বাধ্য করে নিজের ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে হোসেন মিয়ার আজ্ঞাবহ হতে। কুবেরের অসহায়ত্ব প্রমাণ করে যে, অতি-দরিদ্র মানুষের কাছে ‘নৈতিকতা’ একটি বিলাসিতা মাত্র।

‘পদ্মা নদীর মাঝি’র প্রথম অংকে পুঁজিবাদের করাল থাবা থাকলেও দ্বিতীয় অংকটি ফ্রয়েডীয়!
​ফ্রয়েড ব্যক্তিত্বকে তিনটি উপাদানে ভাগ করেছেন-
​ইড, ইগো, সুপার-ইগো। ‘ইড’ হচ্ছে জন্মগত এবং আদিম প্রবৃত্তি যৌন তাড়না বা ‘লিবিডো’। এটি কেবল তাৎক্ষণিক তৃপ্তি চায় এটি কোনো যুক্তি বা নিয়ম মানে না। কুবেরের পঙ্গু স্ত্রী মালার সাথে নিস্তরঙ্গ দাম্পত্য জীবনে ঢেউ তোলে মালার বোন কপিলা। কপিলা চতুর, চপল ও উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন এক যুবতী। তার আচরণের মধ্যে কিছুটা আদিম ভাব লক্ষণীয়। যা সমাজের চোখে অনেকটাই নিন্দনীয়। কুবেরও তার স্ত্রী মালার বোন কপিলার প্রতি আদিম আকর্ষণ অনুভব করে। শুরু হয় উপন্যাসে ফ্রয়েডীয় জটিলতা! কপিলা দাম্পত্য সুখহীন, স্বামীর ঘরে সতীন আসায় এখন বাপের বাড়িতে নির্বাসিত জীবন আবার বাপের বাড়ির কটু কথার মাঝে তার একমাত্র প্রশান্তির আশ্রয় বোনের শ্বশুরবাড়ি, যেখানে কুবের আছে, যার সাথে কপিলার আদিম প্রবৃত্তি মেটানোর চেষ্টা। তবে সেই পথে বাঁধা ‘সুপার-ইগো’ তথা সামাজিক বিধিনিষেধ আর তার বোন মালা।

কুবের আদিম প্রবৃত্তির তাড়নায় কপিলার কাছে যেতে চাইলেও তাকে বারবার বাঁধা দেয় ‘সুপার-ইগো’ যা সমাজ ও পরিবারের শেখানো নিয়ম ও মালার প্রতি তার দায়বদ্ধতা। যখন ‘ইড’ এবং ‘সুপার-ইগো’র মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগে, তখন মনে যে উদ্বেগ তৈরি হয় তা থেকে বাঁচতে ‘ইগো’ রিপ্রেশন বা দমনের কৌশল ব্যবহার করে। কপিলার বাঁকা চোখে তাকানো, হাঁটার ভঙ্গি, ব্যাঙ্গাত্মক কথা ‘আহারে পুরুষ’ এ সাড়া দিতে পারে না কুবের। কিন্তু যখন কুবের যাত্রা করে ময়নাদ্বীপে তার সাথে যাবার জন্য যখন কপিলা বলে, “আমারে নিবা মাঝি লগে?” তখন সেখানেই ‘ইড’ তথা আদিম প্রবৃত্তির কাছে পরাজয় ঘটে ‘সুপার-ইগো’র।  কেতুপুর গ্রামের সামাজিক বিধিনিষেধের বেড়াজালে কুবের আর কপিলার আদিম প্রবৃত্তি পূরণ সম্ভব নয়। সামাজিক স্বীকৃতি তারা কখনো পেতো না। তাই ফ্রয়েডের মনসমীক্ষণ তত্ত্বের  ‘সুপার-ইগো’র পরাজয় ঘটিয়ে ‘ইড’য়ের তাড়নায় কপিলা কুবেরের সাথে পাড়ি দেয় ময়নাদ্বীপে, যেখানে কুবের-কপিলার মাঝে নেই কোনো সামাজিক আইনের বিধিনিষেধ।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘পদ্মা নদীর মাঝি’তে দেখিয়েছেন মানুষের জীবন কেবল আকাশছোঁয়া দর্শন দিয়ে চলে না। মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রিত হয় তার জৈবিক তাড়না (ফ্রয়েড) এবং পেটের ক্ষুধা (মার্ক্স) দিয়ে। কুবের, কপিলা এবং হোসেন মিয়া—প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে এই দুই ধ্রুব সত্যের শিকার। মানিকের এই উপন্যাস সমাজের অবদমিত মনস্তত্ত্ব এবং শ্রেণি-শোষণের নগ্ন রূপটিকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে পাঠকের মনে।

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয়বস্তু:

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!