শিরোনাম:
Network News BD
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেনু
প্রচ্ছদ

© 2026 Network News BD

বিপুল সম্ভাবনাময় ভেন্না গাছ

তানজিদ শুভ্র

তানজিদ শুভ্র

প্রকাশিত: ২৪ মার্চ ২০২৬, ৬:১৪ PM ১২ বার পঠিত
বিপুল সম্ভাবনাময় ভেন্না গাছ

ছবি: সংগৃহীত

“আসমানীরে দেখতে যদি তোমরা সবে চাও,
রহিমদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।
বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।”

পল্লীকবি জসীম উদ্‌দীনের এই কালজয়ী কবিতার লাইনগুলো পড়েননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। আসমানীর সেই জীর্ণ কুটিরের চাল হিসেবে কবি বেছে নিয়েছিলেন ভেন্না পাতাকে। যা আমাদের কাছে চরম দারিদ্র্য আর অবহেলার প্রতীক হয়ে আছে। গ্রামের রাস্তার পাশে বা ঝোপঝাড়ে অযত্নে বেড়ে ওঠা এই গাছটিকে আমরা সাধারণত আগাছা হিসেবেই চিনি। কিন্তু অবহেলিত এই ভেন্না গাছই যে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ক্যাস্টর অয়েলের উৎস, তা অনেকেরই অজানা।

ভেন্না বা রেড়ি গাছের বৈজ্ঞানিক নাম Ricinus communis, যা Euphorbiaceae পরিবারের অন্তর্গত। এর পাতাগুলো বেশ বড় এবং করতলাকার, ঠিক হাতের তালুর মতো ছড়ানো। আর এ কারণেই হয়তো আসমানীর ঘরের চালে এই পাতা ব্যবহার করা হয়েছিল। গাছটি সাধারণত মাঝারি আকারের গুল্মজাতীয় হয়। এর সবুজ বা লালচে ডালপালার ফাঁকে ফোটে গুচ্ছ ফুল। এর ফলগুলো দেখতে ছোট ছোট কাঁটাযুক্ত ক্যাপসুলের মতো, যার ভেতরে লুকিয়ে থাকে মহামূল্যবান বীজ।

ভেন্না গাছের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর টিকে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা। বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গাতেই এই গাছ চোখে পড়ে। রাস্তার ধার, রেললাইনের পাশ, নদীর পাড় বা পতিত জমিতে বিনা যত্নেই এরা বেড়ে ওঠে। খরা বা বৈরী আবহাওয়াতেও এই গাছ দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। এর জন্য আলাদা করে কোনো সার বা কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না।

ভেন্না গাছের মূল আকর্ষণ এর বীজ। এই বীজ থেকেই তৈরি হয় বিখ্যাত ক্যাস্টর অয়েল বা রেড়ির তেল। একসময় চিকিৎসায় এই তেলের ব্যাপক চল ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘আমার ছেলেবেলা’ গ্রন্থে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন, “দৈবাৎ কখনো আমার জ্বর হয়েছে; তাকে চক্ষেও দেখি নি। ডাক্তার একটু গায়ে হাত দিয়েই প্রথম দিনের ব্যবস্থা করতেন ক্যাস্টর অয়েল আর উপোস।”

বর্তমানে রূপচর্চা, বিশেষ করে চুল ও ত্বকের যত্নে এই তেলের ব্যাপক কদর। শিল্পের কাঁচামাল হিসেবেও এর গুরুত্ব অনেক। লুব্রিকেন্ট, সাবান, রং এবং বর্তমানে পরিবেশবান্ধব বায়োডিজেল তৈরিতেও এর ব্যবহার বাড়ছে।

প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়াল দেখা যায় এই বীজে। ভেন্না বীজের আবরণে ‘রিসিন’ নামের অত্যন্ত শক্তিশালী ও মারাত্মক বিষ থাকে। অথচ সেই বিষাক্ত খোলসের ভেতরেই থাকে এমন উপকারী তেল। তেল বের করে নেওয়ার পর উচ্ছিষ্ট খৈলটুকু ফসলের মাঠের জন্য অত্যন্ত পুষ্টিকর জৈব সার ও প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ক্যাস্টর অয়েলের বেশ চাহিদা রয়েছে এবং এর প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ আমাদের দেশের মাটি ও আবহাওয়া ভেন্না চাষের জন্য দারুণ উপযোগী। গ্রামের পতিত, অনুর্বর ও অব্যবহৃত জমিতে বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ করা গেলে এটি কৃষকদের জন্য আয়ের একটি ভালো উৎস হতে পারে। যেহেতু এর উৎপাদনে খরচ ও শ্রম একদমই কম, তাই গ্রামীণ অর্থনীতিতে এটি বড় ভূমিকা রাখার দারুণ সম্ভাবনা রাখে।

ভেন্না গাছ কেবল অর্থনৈতিক দিক থেকেই লাভজনক নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও এর দারুণ ভূমিকা রয়েছে। এই গাছের প্রধান মূল বা শেকড় মাটির বেশ গভীরে প্রবেশ করে। ফলে নদীভাঙন কবলিত এলাকা, চরাঞ্চল কিংবা পাহাড়ের ঢালে মাটি ক্ষয়রোধ করতে ভেন্না অত্যন্ত কার্যকর একটি উদ্ভিদ। বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন অনেক এলাকায় খরা বা দীর্ঘসময় বৃষ্টির অভাব দেখা দিচ্ছে, তখন অত্যন্ত কম পানিতে বেঁচে থাকতে সক্ষম এই গাছটি কৃষকদের জন্য ভরসার জায়গা হতে পারে। কোনো বাড়তি সেচ বা যত্ন ছাড়াই পতিত জমিতে সবুজায়নের পাশাপাশি কার্বন শোষণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যে ভেন্না পাতা একদিন আসমানীর কুটিরের জীর্ণ চাল হিসেবে কবিতায় জায়গা পেয়েছিল, সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিলে সেই ভেন্না গাছই আজ আমাদের অর্থনীতিতে শক্ত ছাদ তৈরি করতে পারে।

মন্তব্য করুন

আজকের নামাজের সময়সূচি (ঢাকা)

সময় লোড হচ্ছে...

ADVERTISEMENT

ফেসবুকে আমরা

প্রতিদিনের খবর ইমেইলে

লিংক কপি হয়েছে!