লিঙ্গীয় বহিঃপ্রকাশ এবং একটি প্রচলিত সামাজিক ভুল ধারণা

মো. মাহাবুব আলম সরকার:
আমাদের চারপাশে ক্লাসরুমে, চায়ের আড্ডায় কিংবা কর্মক্ষেত্রে এমন কিছু ছেলেকে আমরা প্রায়ই দেখি যাদের কথা বলার ধরন হাতের ভঙ্গি হাঁটাচলা কিংবা পোশাক আশাকের রুচি প্রচলিত পুরুষালি ছকের সঙ্গে মেলে না। কণ্ঠস্বরের কোমলতা আবেগের প্রকাশ কিংবা নান্দনিক পছন্দের কারণে সমাজের চোখে তারা হয়ে ওঠে মেয়েলি। আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় ফিসফাস বাঁকা হাসি এবং সবশেষে একটি ঢালাও প্রশ্ন ওরা এমন কেন। এমনকি কোনো কিছু না জেনেই চটজলদি তাদের গায়ে সেঁটে দেওয়া হয় সমপ্রেমীর তকমা। কিন্তু বিজ্ঞানের চশমায় দেখলে আমাদের এই সামাজিক ধারণা কতটা ঠিক। ছেলে হয়েও মেয়েদের মতো আচার আচরণ করার পেছনে মনোবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান আসলে কী বলে আর এদের সবাইকেই কি সমপ্রেমী বলা যায়।
জৈবিক লিঙ্গ লিঙ্গ পরিচয় ও লিঙ্গীয় বহিঃপ্রকাশ তিনটি ভিন্ন জগৎ
সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি তৈরি হয় জৈবিক লিঙ্গ লিঙ্গ পরিচয় এবং লিঙ্গীয় বহিঃপ্রকাশকে এক করে ফেলার কারণে। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন এবং আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণালব্ধ সংজ্ঞা অনুযায়ী মানুষের সত্তার এই দিকগুলো সম্পূর্ণ আলাদা। জৈবিক লিঙ্গ বলতে জন্মের সময় শারীরবৃত্তীয় গঠন ক্রোমোজোম এবং হরমোনের ভিত্তিতে একজন মানুষকে যে পরিচয় দেওয়া হয় যেমন নারী বা পুরুষ তাকে বোঝায়। লিঙ্গ পরিচয় হলো একজন মানুষ ভেতর থেকে নিজেকে কী ভাবছে সে কি নিজেকে পুরুষ মনে করে নারী মনে করে নাকি এর বাইরে অন্য কিছু। লিঙ্গীয় বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে একজন মানুষ তার আচরণ পোশাক বাচনভঙ্গি কণ্ঠস্বর বা চলাফেরার মাধ্যমে সমাজে নিজেকে কীভাবে প্রকাশ করছে। সমাজ কোন আচরণকে পুরুষালি আর কোন আচরণকে মেয়েলি বলবে তা মূলত সংস্কৃতি ও সময়ের ওপর নির্ভর করে। আর যৌন অভিমুখিতা হলো একজন মানুষ মানসিক রোমান্টিক বা শারীরিকভাবে কোন লিঙ্গের মানুষের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে তার দিকনির্দেশনা।
যখন কোনো ছেলে প্রচলিত পুরুষালি আচরণের বাইরে গিয়ে কিছুটা কোমল বা সমাজের চোখে মেয়েলি আচরণ করে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় জেন্ডার নন কনফর্মিটি বা প্রচলিত লিঙ্গ প্রত্যাশার বাইরে থাকা আচরণ।
এদের কি ঢালাওভাবে সমপ্রেমী বলা যায়
এককথায় উত্তর হলো না ঢালাওভাবে এদের গে বা সমপ্রেমী বলা সম্পূর্ণ ভুল এবং অবৈজ্ঞানিক। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের গাইডলাইন স্পষ্টভাবে জানায় গে শব্দটি মূলত যৌন অভিমুখিতা বা আকর্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থাৎ একজন পুরুষ যখন অন্য একজন পুরুষের প্রতি রোমান্টিক বা শারীরিক আকর্ষণ অনুভব করেন। অন্যদিকে একজন ছেলের কথা বলা বা চলাফেরা মেয়েলি হওয়াটা তার লিঙ্গীয় বহিঃপ্রকাশ বা ব্যক্তিত্বের অংশ এটি তার যৌন আকর্ষণের মাপকাঠি নয়। অর্থাৎ কোনো ছেলের হাঁটাচলা বা কথা বলার ভঙ্গি দেখেই তাকে সমপ্রেমী বলে চিহ্নিত করা কেবল অনুমাননির্ভর ভুলই নয় বরং এটি তার ব্যক্তিগত পরিচয়ের ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপ। অনেক সম্পূর্ণ বিষমপ্রেমী বা নারীর প্রতি আকৃষ্ট পুরুষের আচরণও স্বভাবগতভাবে কোমল বা মেয়েলি হতে পারে আবার অনেক সমপ্রেমী পুরুষের আচরণ হতে পারে প্রচলিত অর্থে শতভাগ পুরুষালি।
গবেষণা কী বলে ও কেন কেউ এমন আচরণ করে
কেন কিছু ছেলে ছোটবেলা থেকেই প্রচলিত পুরুষালি আচরণের বদলে ভিন্ন রকম বা কোমল আচরণ করে তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে এটি কোনো অভিনয় ইচ্ছাকৃত ঢং বা মানসিক রোগ নয়।
শৈশবকালীন জেন্ডার নন কনফর্মিটি ও সহজাত প্রবণতা বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী গেরুলফ রিগার ও তাঁর সহকর্মীদের ২০০৮ সালের একটি বিখ্যাত গবেষণায় শৈশবের হোম ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে অনেক শিশুর মধ্যেই খুব অল্প বয়স এমনকি দুই থেকে চার বছর বয়স থেকে জেন্ডার নন কনফর্মিটি বা প্রচলিত লিঙ্গ আচরণের ব্যতিক্রমী প্রকাশ দেখা যায় যখন তাদের ওপর সামাজিক বা যৌন কোনো ধারণার প্রভাব পড়ার সুযোগই থাকে না। এটি প্রমাণ করে যে আচরণের এই বৈচিত্র্য অনেকটাই সহজাত।
শৈশবের আচরণ বনাম প্রাপ্তবয়স্ক যৌন অভিমুখিতা নিয়ে যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষকদের ২০২১ সালের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে শৈশবের জেন্ডার নন কনফর্মিটির সঙ্গে পরবর্তীকালে সমপ্রেমী হওয়ার একটি পরিসংখ্যানগত সংযোগ থাকলেও দুটি বিষয় কখনোই এক নয়। অর্থাৎ শৈশবে মেয়েলি আচরণ করা মানেই যে সে বড় হয়ে সমপ্রেমী হবে এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই বরং বড় একটি অংশ পরবর্তীকালে বিষমপ্রেমী হিসেবেই জীবন যাপন করে।
জিনগত ও প্রাক জন্ম হরমোনের প্রভাব সম্পর্কে ২০২৩ সালে ফিনিশ টুইন কোহর্ট নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে মানুষের আচরণগত বৈচিত্র্য ও অভিমুখিতার পেছনে জিনগত বৈশিষ্ট্য মাতৃগর্ভে থাকাকালীন হরমোনের প্রবাহ এবং পরিবেশগত উপাদানের জটিল মিথস্ক্রিয়া কাজ করে। মা বাবার শাসন বা লালন পালনের ত্রুটির কারণে ছেলে মেয়েলি হয়ে যায় প্রচলিত এই কুসংস্কারের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
সামাজিক বুলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে গবেষণায় সবচেয়ে উদ্বেগের যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হলো সমাজের নিষ্ঠুর আচরণ। মেয়েদের মধ্যে একটু ডানপিটে বা টমবয় ভাব থাকলে সমাজ যতটা সহজে মেনে নেয় ছেলেদের মধ্যে একটু কোমল বা মেয়েলি ভাব থাকলে সমাজ ততটাই রূঢ় আচরণ করে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে জেন্ডার নন কনফর্মিং আচরণের কারণে যেসব ছেলে পরিবার ও সমাজ থেকে নেতিবাচক আচরণ তিরস্কার ও বুলিংয়ের শিকার হয় তাদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও মানসিক ট্রমার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। অথচ পরিবার সহনশীল ও মানবিক হলে এই মানসিক ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে।
আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো কেন জরুরি
পুরুষ মানেই তাকে সব সময় কাঠখোট্টা হতে হবে গম্ভীর গলায় কথা বলতে হবে কিংবা আবেগ লুকিয়ে রাখতে হবে এই ধারণাটি প্রকৃতির তৈরি নয় বরং সমাজের তৈরি একটি ছক। প্রকৃতিতে প্রতিটি মানুষই অনন্য। কারও কণ্ঠস্বর নরম কারও হাত নাড়ার ভঙ্গি ছন্দময় আবার কারও মনস্তত্ত্ব প্রচলিত ছকের বাইরে। তাই পরেরবার কাউকে দেখে ওরা এমন কেন এই প্রশ্ন তোলার আগে আমাদের মনে রাখা দরকার তারা এমন কারণ প্রকৃতি ও মানবিক বৈচিত্র্য তাদের এভাবেই গড়ে তুলেছে। বাহ্যিক আচরণ দেখে কাউকে সমপ্রেমী বলে ট্যাগ দেওয়া কিংবা উপহাস করা কোনো সুস্থ সমাজের পরিচয় হতে পারে না। মানুষের পরিচয় তার পোশাকে বা হাতের ভঙ্গিতে নয় বরং তার মানবিকতায়। সমাজের বাঁকা চোখ সরিয়ে সহমর্মিতার দৃষ্টি দিলে তবেই এই মানুষগুলো আমাদেরই একজন হয়ে বাঁচার স্বাভাবিক আনন্দটুকু খুঁজে পাবে।
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।