উন্নয়নের আলোয় উপেক্ষিত শ্রমিকের জীবন

বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী ঢাকার এই ঝলমলে শহরে নিভু নিভু আলোতেই স্নিগ্ধ ভোরের দেখা না পেতেই বেরিয়ে পড়েন এক দল মানুষ, কাজের সন্ধানে। ঝলমলে আলোর নিচে চাপা পড়ে যায় হাজারো অন্ধকার গল্প। যে গল্পগুলো লেখা হয় ঘামে, ক্ষুধায় ও দীর্ঘশ্বাসে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরেও যাদের পকেট থাকে প্রায় শূন্য। ঢাকার এই ব্যস্ত শহরে তাদের জীবন কি শুধুই বেঁচে থাকা, নাকি বেঁচে থাকার লড়াই? এই শহরের আলো সবার জন্য সমান নয়, এই বৈষম্যের চিত্র, আশা, হতাশা এবং নতুন ভোরের অপেক্ষা নিয়ে ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীদের ভাবনা তুলে ধরেছেন সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইডেন মহিলা কলেজ শাখার প্রচার সম্পাদক সাবিহা তারান্নুম মিম।
ঝলমলে শহরে নিভু নিভু জীবন
- অর্পা খন্দকার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
শহরের ঝলমলে আলো আর উন্নয়নের চাকচিক্যের আড়ালে চাপা পড়ে আছে অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম। যাঁদের শ্রমে গড়ে ওঠে অট্টালিকা, সচল থাকে নগরের অর্থনীতি, তাঁদেরই জীবনে স্বস্তির চেয়ে অনিশ্চয়তা বেশি। দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে প্রতিদিনের জীবন যেন টিকে থাকার এক নিরন্তর লড়াই ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনিয়মিত কাজ ও অনিশ্চিত আয়ের কারণে অনেক পরিবারকে খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে। সন্তানের ভবিষ্যৎ, পরিবারের পুষ্টি ও জরুরি চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাঁদের প্রতিনিয়ত আপস করতে হচ্ছে। অথচ নগরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের অবদান অপরিসীম। এই সংকট কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়, সামাজিক বৈষম্যের প্রতিফলন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা, সাশ্রয়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। শহরের উন্নয়ন তখনই সার্থক হবে, যখন তার সুফল প্রান্তিক মানুষের জীবনেও পৌঁছাবে এবং তাঁদের জীবিকা পাবে নিরাপত্তা ও মর্যাদা।
উন্নয়নের আলোয় উপেক্ষিত প্রান্তিক জীবন
- মাহমুদা তাসমিহ, সমাজকর্ম বিভাগ
শহরের ঝলমলে আলো আর ব্যস্ততম সড়কের পাশেই প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে লড়াই করেন অসংখ্য প্রান্তিক মানুষ। ভোরে কাজে বের হওয়া দিনমজুর, সীমিত পূুঁজিতে দোকান চালানো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা স্বল্প আয়ের চাকরিজীবী সবার জীবনেই রয়েছে টিকে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে তাদের সংসারের হিসাব ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। চাল, ডাল, তেল, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় চাহিদাও কমিয়ে আনতে হচ্ছে। দিনমজুরের কাজ না থাকলে চুলা জ্বলে না,আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর বিক্রি কমলে সংসারের বাজেটেও টান পড়ে। প্রতিদিনের এই অনিশ্চয়তা তাদের জীবনকে গড়ে তুলছে আরও দুর্বিষহ।অথচ শহরের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এই মানুষগুলোর অবদান অপরিসীম। তাই ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। উন্নয়নের আলো তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা প্রান্তিক মানুষের জীবনেও স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।
প্রান্তজনের ঘামে লেখা নগর-সভ্যতা
– মোছা. বৈশাখী খাতুন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ইট-পাথরে গড়ে ওঠা একটি শহর, আলোকসজ্জায় ভরে ওঠা প্রত্যেকটি কোণা কিংবা উন্নতির চরম শিকড়ে পৌঁছানো এ সবকিছুই দাঁড়িয়ে রয়েছে কিছু শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঘাম ঝরানো অজস্র শ্রম, তাদের আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম। যার পিছনের গল্পে লুকিয়ে থাকা মানুষগুলোর কেউ কেউ দিনমজুর কেউবা পোশাক শ্রমিক কেউ আবার স্বল্প আয়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এসব মানুষগুলো প্রতিনিয়ত নগরকে আলোকিত করে তুলছে ঠিকই কিন্তু তাদের জীবনেই নেই এতটুকু আলো। উন্নয়নমুখী শহরের ভিড়ে চাপা পড়ে যাই তাদের অন্ধকার জীবনের গল্প। স্থায়ী জীবিকার অনিশ্চয়তা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি কিংবা পারিবারিক ব্যয় সামলানোর মধ্যেই এসব খেটে খাওয়া মানুষকে দিনাতিপাত করতে হয়। চলে নিরন্তর পরিশ্রম ও লড়াই । জীবনের অনিশ্চয়তা জেনেও জীবিকার তাগিদে যে কোন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে দ্বিধাবোধ করে না। বাস্তব সত্য এটাই যে, এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষগুলোই আজ সবচেয়ে বেশি সুবিধাবঞ্চিত। মৌলিক অধিকার, আইনি সুরক্ষা ও নিরাপত্তা, শ্রমের ন্যায্যমূল্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সেবা, তাদের সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা সব ক্ষেত্রেই রয়েছে পিছিয়ে। ভুগছে বৈষম্য, প্রকৃত সম্মান ও পরিচয়হীনতায়। একটি রাষ্ট্রের অগ্রগতি ও শহরের প্রকৃত রূপ তখনই সার্থক যখন এসব মানুষগুলোর জীবন থেকে অন্ধকার দ্রবীভূত হবে, খুঁজে পাবে একটুখানি আলোর রেখা। তাই, শহরের আলো যেন শুধুমাত্র বিত্তশালীদের প্রাচুর্যের প্রতীক না হয়ে সেই আলোর সমান অংশীদার হয়ে উঠতে পারে এ সকল নিম্ন আয়ের মানুষেরা। তারাও যেন পায় সমান মর্যাদা, অধিকার আত্মসম্মান ও স্বাধীনতা। এজন্যে তাদের উপর সমাজ, রাষ্ট্র ও সর্বসাধারণের বিশেষ দৃষ্টি ও সম্মিলিত উদ্যোগ থাকা উচিত।
আয়-ব্যয়ের হিসাবে আটকে থাকা জীবন
– আফিয়া মোবাশসিরা ঐশী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার খরচ কিংবা সন্তানের লেখাপড়ার খরচ মেটাতে হিমশিম খাওয়া, এমনকি দুবেলা না খেয়ে থাকা প্রান্তিক মানুষের গল্পগুলো যেন চাপা পড়ে আছে শহরের ঝলমলে আলোর পেছনে। শহরের উঁচু ভবন, বিলাসবহুল গাড়ি এবং ঝলমলে আলোর পেছনে প্রতিদিন চলে দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই। দিনমজুরের অনিশ্চিত কর্মসংস্থান ও আয়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সীমিত আয় এবং নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় সব মিলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা যেন দিন দিন কঠিন হয়ে উঠেছে। সেই সাথে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্রমবর্ধমান দাম তাদের টিকে থাকার লড়াইকে আরো কঠিন করে তুলেছে। চাল, ডাল ও তেল সহ অন্যান্য সামগ্রীর দাম বাড়তে থাকায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন এই শ্রেণীর মানুষগুলো। ফলে আয় এবং ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। কখনো পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের শখ ও পড়াশোনার চাহিদা অপূর্ণ রেখে জীবিকা নির্বাহ করছে। শুধু তাই নয় অতিরিক্ত বাসাভাড়ার খরচ মেটাতে না পারায় আশ্রয় নিচ্ছে বিভিন্ন অস্বাস্থ্যকর বস্তিতে। ফলে তাদের স্বাস্থ্য চরম হুমকির মুখে। সেই সাথে বাড়ছে শিশুশ্রম। আর এর ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। একদিকে অধিক জীবনযাত্রার ব্যয়, অন্যদিকে সীমিত আয় তাদের জীবনে যেন নীরব আর্তনাদ হয়ে উঠেছে। যাদের শ্রমে গড়ে উঠছে শহর তারাই অবহেলিত। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতকরণ এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা বাড়ানো জরুরী। শহরের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়ে উঠবে যখন তার সুফল সকল শ্রেণির মানুষের জীবনে পৌঁছাবে।
বিলাসী শহরের আড়ালে মানবেতর জীবন
– জান্নাত আক্তার শিলা, রসায়ন বিভাগ
চাকচিক্যময় বহুতল ভবনে ঘেরা রঙিন শহরের ছায়ায় ঢাকা পড়ে আছে এক বিবর্ণ বাস্তবতা। রাজধানী বা যেকোনো মফস্বল শহরের বিলাসী জীবনযাপনের আড়ালে চাপা থাকে দিনমজুর, রিকশাচালক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা সামান্য বেতনে সংসার চালানো কর্মজীবী মানুষের টিকে থাকার নির্মম সংগ্রাম। যাঁদের আয় সীমিত তাঁদের জীবনে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি থেকে শুরু করে গ্যাস বা জ্বালানির দাম, বিদ্যুৎ বিল এমনকি যাতায়াত ভাড়া ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় তাঁরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাঁদের সীমিত আয়ে পরিবারের ভরণপোষণ, শিক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে ঐসব পরিবারের শিশুরা শিক্ষা ও বৃদ্ধরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের শ্রমজীবী মানুষের উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিতবিহীন দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। শহরের উন্নয়ন কেবল উঁচু ভবন আর আলোকসজ্জায় নয় সীমাবদ্ধ থাকলেই চলবে না বরং মানুষের জীবনমানেও তার প্রতিফলন থাকা আবশ্যক। ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষদের জীবনে স্বস্তি ফেরানো সম্ভব।
শুভ্র/