বিশ্বদর্শনে লালন সাঁই এবং অসাম্প্রদায়িক মানবধর্ম

মরিয়ম ফেরদৌস:
বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের স্মরণোৎসব বা তিরোধান দিবস ঘিরে প্রতিবছরই একতারার সুরে মুখর হয়ে ওঠে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া। লালন আখড়াবাড়িতে সমবেত হন সাধক বাউল ভক্ত দর্শনার্থী গবেষক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা। গানে গানে স্মরণ করা হয় বাংলার মরমি সাধনধারার এই অনন্য ব্যক্তিত্বকে। বসে মেলা হয় আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে লালনের গানের সুর। তবে এই উৎসবের ভেতরেই থেকে যায় একটি গভীর প্রশ্ন। লালনকে স্মরণ করার অর্থ কি কেবল তাঁর গান গাওয়া নাকি তাঁর দর্শনকে নিজের জীবনে ধারণ করা।
লালন সাঁইয়ের প্রাসঙ্গিকতা এখানেই। তিনি মানুষকে দেখার প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করেছেন বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে থাকা মানবসত্তার সন্ধান করেছেন এবং আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়ে সত্যকে জানার সাধনায় নিমগ্ন থেকেছেন। তাঁর গানে মানুষ মন ও অন্তর্জগতের যে অনুসন্ধান প্রকাশিত হয়েছে তা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সীমানায় আটকে নেই। বরং মানুষে মানুষে বিভাজন যখন নতুন নতুন রূপে সামনে আসে তখন লালনের গান আমাদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও প্রশ্ন তুলতে শেখায়।
ছেঁউড়িয়ার এই স্মরণোৎসব তাই শুধু একজন সাধকের তিরোধান দিবস নয় এটি তাঁর দর্শনকে নতুন করে পাঠ করার তাঁর মানবিক বোধের সঙ্গে বর্তমান সমাজের সম্পর্ক বিচার করার এবং নিজেদের ভেতরের মানুষটিকে খুঁজে দেখারও উপলক্ষ।
মরমি সাধক লালন রচিত গানগুলোতে আধ্যাত্মিকতা মানে শুধু ধর্মীয় ভক্তি নয় বরং এটি আত্ম অনুসন্ধান মানব প্রেম দেহের রহস্য এবং জাত ধর্মের ঊর্ধ্বে পরম সত্য খোঁজার এক দর্শন। তাঁর প্রায় দুই হাজার গানই আধ্যাত্মিক ভাবধারায় রচিত। লালনের আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্রে আছে মনের মানুষ বা অন্তরের পরমাত্মাকে জানার আকাঙ্ক্ষা।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায় গানে লালন দেহকে খাঁচা এবং আত্মাকে অচিন পাখি রূপে চিত্রিত করেছেন এবং আসা যাওয়া বলতে বুঝিয়েছেন জন্ম মৃত্যুর রহস্য বা আত্মার দেহে আগমন ও তিরোধানকে। লালন প্রশ্ন করছেন পাখিটি কোন পথে আসে আর কোন পথে যায় অর্থাৎ আমি কে আমার আগমন কোথা থেকে আবার মৃত্যুর পর কোথায় যাব এমনই মৌলিক প্রশ্ন। আত্মাকে ধরতে পারলে মন বেড়ি দিতে চেয়েছিলেন তিনি।
লালনের অন্যতম আরেক গান মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষেরও সনে। এখানে তিনি প্রকাশ করেছেন জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনের আকুল আকাঙ্ক্ষা। গানটি শুরু হচ্ছে একটি প্রশ্ন দিয়ে কত দিন অপেক্ষা করতে হবে মনের মানুষের সঙ্গে মিলনের জন্য। এই প্রশ্ন শুধু বিরহের আর্তনাদ নয় এটি সাধকের আত্মোন্নতির আকুতি যেখানে সে জানে মিলন সম্ভব তবে তার জন্য প্রয়োজন শুদ্ধ সাধনা ও আত্মজ্ঞান। এখানে মনের মানুষ হলেন অন্তরের পরম সত্য বা প্রিয়তম আর মিলন মানে সেই সত্যকে উপলব্ধি করে আত্মিক ঐক্য লাভ করা। এই গানে লালনের মূল বার্তা হলো বাইরের মসজিদ মন্দির বা তীর্থ নয় নিজের অন্তরেই খুঁজতে হবে প্রিয়তমকে। সত্য দূরে নয় মনের গভীরে। মিলন তখনই হবে যখন মন সত্যকে চিনবে।
লালনের সময়ে হিন্দু মুসলমান বিভাজন ব্রাহ্মণ শূদ্র ভেদ এবং উচ্চ নিম্ন জাতের প্রথা ছিল প্রবল। তিনি এসব সামাজিক বিভাজনকে মানুষের সৃষ্ট কৃত্রিম প্রথা বলে চিহ্নিত করেন এবং মানবধর্মকেই আসল ধর্ম বলে ঘোষণা করেন। তাঁর রচিত জাত গেল জাত গেল বলে, সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে, জাত না গেলে পাইনে হরি প্রভৃতি গানে ধর্ম ও জাতপ্রথার ঊর্ধ্বে মানবধর্মকে স্থান দিয়েছেন। তাঁর মতে জাত বা ধর্মের বাহ্যিক চিহ্ন দিয়ে কারও মর্যাদা নির্ধারণ করা যায় না। কারণ সব মানুষের দেহ প্রাণ কষ্ট ও মৃত্যু একই রকম। তাই সবার মধ্যেই একই মানবিক সত্তা বিরাজ করে। জাত না গেলে পাইনে হরি গানে তিনি বলেন জাতের গৌরব করে লাভ নেই আত্মার শুদ্ধি ছাড়া কেউ পরম সত্য পাবে না। আবার সব লোকে কয় গানে তিনি জাতের সংজ্ঞাই চ্যালেঞ্জ করছেন যা চোখে দেখা যায় না তা দিয়ে মানুষের পরিচয় কীভাবে হবে।
বিশ্ব সাহিত্য ও দর্শনে লালনের প্রভাব মূলত তাঁর মানবতাবাদ আত্মতত্ত্ব অসাম্প্রদায়িকতা ও গানের রহস্যবাদ দিয়ে ছড়িয়েছে। তিনি সরাসরি বিশ্বদর্শনে প্রভাব ফেলেননি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেক সাহিত্যিক চিন্তাবিদ ও সংগীতজ্ঞের মধ্য দিয়ে তাঁর ভাবধারা আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছেছে।
লালনের প্রভাব বিশ্বে পৌঁছানোর সবচেয়ে বড় পথ হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। জমিদারি তদারকির সূত্রে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে আসেন ও সে সময় বাউল গানের সঙ্গে পরিচিত হন এবং গগন হরকরার মাধ্যমে লালনের গান ও দর্শনের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি লালনের গান সংগ্রহ করেন জনপ্রিয় করেন এবং নিজের কবিতা গান প্রবন্ধ ও দর্শনে বাউল ভাবনাকে ব্যবহার করেন। তাঁর গীতাঞ্জলি ও মানুষের ধর্মে বাউল দর্শনের প্রভাব লক্ষ করা যায় যেখানে তিনি মানুষের মধ্যেই অসীমের প্রকাশ জাত ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবিক ঐক্য এবং আত্মার স্বাধীনতার কথা বলেছেন যা লালনের দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমেরিকান বিট কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ লালন ও বাউল ঐতিহ্যে আগ্রহী ছিলেন। গিন্সবার্গের মাধ্যমে লালনের নাম পশ্চিমা কাউন্টারকালচার ও আধ্যাত্মিক সাহিত্য আলোচনায়ও এসেছে। তাঁর গানের সরল সুর ও গভীর দার্শনিক ভাষা বিদেশি গবেষক অনুবাদক ও সংগীতশিল্পীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
লালন এখন কেবল বাংলার বাউল সাধক নন তিনি মানব ভ্রাতৃত্ব শান্তি সমতা ও অসাম্প্রদায়িকতার একটি বিশ্বজনীন প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর দর্শন বিশ্বের সামনে একটি বিকল্প প্রশ্ন তোলে ধর্ম ও পরিচয়ের বিভাজনের বদলে মানুষকে মানুষ হিসেবে চিনলে কী হয়।
আজকের সমাজে যেখানে বিভাজন বৈষম্য ও হিংসা বিদ্বেষ বারবার নতুন রূপ নিচ্ছে সেখানে সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই বাণীটি একটি নৈতিক পথনির্দেশক। তাই বাউলসম্রাট লালনকে সম্মান জানানোর সবচেয়ে বড় পন্থা হলো তাঁর গান গাওয়ার পাশাপাশি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা ভেদবুদ্ধি ত্যাগ করা এবং নিজের মধ্যকার মনের মানুষকে খুঁজে বের করা। তিরোধানের ওপারে লালন তাই মৃত নন তিনি আজও বেঁচে আছেন প্রতিটি মানবিক সংবেদন সহনশীলতা ও আত্মোপলব্ধির অনুসন্ধানে।
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।