মনের কথা কীভাবে জেনে যায় স্মার্টফোন?

জান্নাত আক্তার শিলা:
তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির ফলে মানুষ আজ বহুলাংশে প্রযুক্তিনির্ভর। বিনোদন বা নিত্যকার কাজের প্রায় পুরোটাই এখন প্রযুক্তির দখলে। তবে বর্তমান যুগের সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, স্মার্টফোনের অ্যাপগুলো যেন ব্যবহারকারীর মনের কথা অনায়াসেই জেনে ফেলছে। হঠাৎ মন খারাপ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলেই দেখা যায় মন খারাপের ক্যাপশন ও মিউজিকসহ ভিডিও সামনে আসছে। আবার কখনো হয়তো মনে মনে যা ভাবা হচ্ছে, হুবহু সেই বিষয়ের ভিডিও হাজির হচ্ছে স্ক্রিনে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, গুগল বা ফেসবুক কি কোনোভাবে মনের খবর রাখে? কখনো বন্ধুর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের জুতো কেনার বিষয়ে কথা বলার কয়েক মিনিট পরেই হয়তো ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে সেই একই জুতোর বিজ্ঞাপন ফোনের স্ক্রিনে ভাসতে দেখা যায়।
মনে মনে কোনো জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার কথা ভাবা হলে অথবা গুগলে কিছু লিখতে গেলেই সার্চ ইঞ্জিনটি মনের কথাটিই আগে থেকে সাজেস্ট করে। এমন অভিজ্ঞতা বর্তমান যুগে প্রায় প্রতিটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরই হচ্ছে। এই রহস্যময় ঘটনার পর অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, গুগল বা ফেসবুক কি সত্যিই মানুষের মনের চিন্তা চুরি করছে? তারা কি মানুষের মস্তিষ্ক পড়তে পারে? প্রকৃত অর্থে তারা মানুষের মন বা চিন্তা সরাসরি পড়তে পারে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বর্তমান স্তর এখনো মানুষের মস্তিষ্কের তরঙ্গ সরাসরি দূর থেকে পড়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে আসল সত্যটি এর চেয়েও বেশি চমকপ্রদ।
তারা মানুষের চিন্তা চুরি করছে না, বরং ডিজিটাল পদচিহ্ন বিশ্লেষণ করে মানুষের পরবর্তী চিন্তাটি কী হতে পারে তা নিখুঁতভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি চলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিগ ডেটার মাধ্যমে। একজন ব্যক্তি যখন স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, তখন তাঁর অজান্তেই জীবনের অজস্র তথ্য প্রযুক্তির হাতে তুলে দেন। কোন পোস্টে কত সেকেন্ড চোখ আটকে থাকছে, কোন ধরনের ভিডিওতে লাইক দেওয়া হচ্ছে, কার সঙ্গে বেশি চ্যাট করা হচ্ছে, এমনকি ফোনের জিপিএস লোকেশন অন থাকায় কোনো ব্যক্তি কখন কোথায় যাচ্ছেন এসব তথ্যই প্রতিনিয়ত রেকর্ড হচ্ছে। গুগল এবং মেটা সবার এই হাজারো ডেটা পয়েন্ট সংরক্ষণ করে একটি ডিজিটাল ক্লোন বা মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইল তৈরি করে। তাদের উন্নত অ্যালগরিদম মানুষের বয়স, লিঙ্গ, পেশা, অর্থনৈতিক অবস্থা এবং মানসিক পছন্দ অপছন্দ এত নিখুঁতভাবে বোঝে যা হয়তো খুব কাছের মানুষটিও জানে না। যখন কোনো ব্যক্তির হাজারটা আচরণের প্যাটার্ন তাদের জানা থাকে, তখন ওই ব্যক্তি পরবর্তী মুহূর্তে কী ভাবতে পারেন বা কী কিনতে পারেন তা অনুমান করা অ্যালগরিদমের জন্য মোটেও কঠিন কাজ নয়। একে বলা হয় প্রেডিক্টিভ অ্যানালিটিক্স বা অনুমানমূলক বিশ্লেষণ।
অনেক সময় মানুষ মুখে যা বলে ঠিক সেটাই বিজ্ঞাপনে চলে আসে। এর পেছনে রয়েছে ফোনের কিছু অ্যাপকে দেওয়া মাইক্রোফোনের অনুমতি। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকাশ্যে দাবি করে তারা গোপনে ব্যবহারকারীর কথা শোনে না। কিন্তু অনেক স্বাধীন গবেষক দেখিয়েছেন, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট সচল রাখার স্বার্থে ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রচুর ডেটা প্রসেস হয়। এর চেয়েও বড় ভূমিকা রাখে একজন ব্যক্তির চারপাশের মানুষের ডেটা। ধরা যাক কোনো বন্ধু গুগলে একটি ল্যাপটপ সার্চ করলেন। যেহেতু ফেসবুক ও গুগল জানে যে তাঁরা দুজন বন্ধু এবং জিপিএস লোকেশন অনুযায়ী একই ক্যাফেতে বসে কফি খাচ্ছেন, তাই অ্যালগরিদম ধরে নেয় অপর বন্ধুরও ল্যাপটপের প্রতি আগ্রহ থাকতে পারে। ফলে তাঁর ফোনেও ল্যাপটপের বিজ্ঞাপন চলে আসে। তখন মনে হয় চিন্তা চুরি হয়েছে, অথচ এটি মূলত ডেটা নেটওয়ার্কের খেলা। চিন্তা চুরি না হলেও ব্যবহারকারীর মনোযোগ আর সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা ঠিকই প্রভাবিত হচ্ছে। এসব কোম্পানির মূল ব্যবসাই হলো বিজ্ঞাপন। তাই যত বেশি সময় স্ক্রিনে ধরে রাখা যায় তাদের আয় তত বাড়ে। অ্যালগরিদম শেখে কোন কনটেন্ট রাগিয়ে দেয়, ভয় দেখায় বা কৌতূহলী করে এবং তারপর সেটাই বারবার সামনে আনে। এতে সবাই ক্রমে কী কিনবে, কী পড়বে, কাকে বিশ্বাস করবে তার ওপর এক নীরব প্রযুক্তিগত প্রভাব পড়ে। এটাই সেই নীরব চুরি।
প্রযুক্তির এই যুগে পুরোপুরি ডিজিটাল দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া সম্ভব নয়। তবে কিছু সচেতন পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব। প্রথমত অ্যাপ পারমিশন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফোনের সেটিংসে গিয়ে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা গুগলের মতো অ্যাপগুলোর মাইক্রোফোন, ক্যামেরা এবং লোকেশন পারমিশন বন্ধ করে রাখা উচিত। কেবল যখন প্রয়োজন হবে তখন সাময়িকভাবে তা অন করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত ট্র্যাকিং ও পারসোনালাইজড অ্যাড বন্ধ করতে হবে। গুগল এবং ফেসবুকের সেটিংস এবং প্রাইভেসি অপশনে গিয়ে এই অপশনটি বন্ধ করা যায়। গুগলের মাই অ্যাক্টিভিটি পেজে গিয়ে লোকেশন হিস্ট্রি এবং ওয়েব অ্যাক্টিভিটি অটো ডিলিট সেট করে রাখা একটি কার্যকর উপায়।
তৃতীয়ত বিকল্প সার্চ ইঞ্জিন ও ব্রাউজার ব্যবহার করা যেতে পারে। গুগল ক্রোম বা সাফারির বদলে ব্রেভ বা ডাকডাকগো এর মতো প্রাইভেসি ফোকাসড ব্রাউজার ও সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করলে ডেটা ট্র্যাক হওয়ার ঝুঁকি কমে। চতুর্থত ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন ব্যবহার করা যেতে পারে। ইন্টারনেটে আসল আইপি অ্যাড্রেস এবং অবস্থান লুকিয়ে রাখতে একটি ভালো মানের ভিপিএন ব্রাউজিং ডেটা এনক্রিপ্ট করে রাখে। পঞ্চমত স্মার্ট ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট বন্ধ রাখা জরুরি। ফোনের ভয়েস কমান্ড অপশনগুলো বন্ধ রাখলে ফোন সবসময় কথা শোনার জন্য ব্যাকগ্রাউন্ডে মাইক্রোফোন চালু রাখবে না। সবশেষে শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইন নিশ্চিতকরণের দাবি তুলতে হবে, যেখানে ব্যবহারকারীর সম্মতি, তথ্য মুছে ফেলার অধিকার এবং কোম্পানির জবাবদিহি স্পষ্ট থাকবে।
মুক্তবাজার অর্থনীতির এই যুগে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ডেটা বা তথ্যই হলো সবচেয়ে মূল্যবান জ্বালানি। গুগল বা ফেসবুক ব্যক্তির মাথার ভেতর ঢুকে চিন্তা তুলে নিচ্ছে না সত্যি, তবে সবার প্রতিটি পদচিহ্ন বিশ্লেষণ করে তারা ভবিষ্যৎ আচরণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখে। আর সেই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মনোযোগকে বাণিজ্যে পরিণত করছে। এই সুবিধার বিনিময়ে মানুষ নিজের কতটা গোপনীয়তা বিসর্জন দিচ্ছে, সেই হিসাব রাখাই আজ সবচেয়ে জরুরি। প্রযুক্তি ছাড়া বর্তমান সময়ে চলা কঠিন, তবে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা তার চেয়েও বেশি জরুরি।