শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

আপনি কি কথায় কথায় ‘সরি’ বলেন? জেনে নিন এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

আমাদের চারপাশে এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা কথায় কথায় ‘সরি’ বা দুঃখিত বলেন। কেউ হয়তো খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন করার আগেও ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন, কেউ নিজের মতামত জানাতে গিয়ে গুটিয়ে যাচ্ছেন, আবার কারও ক্ষেত্রে অন্যের ভুলের কারণেও নিজের মুখ থেকেই সরি শব্দটি বেরিয়ে আসছে। ভুল করলে ক্ষমা চাওয়া অবশ্যই একটি সুন্দর ও দায়িত্বশীল আচরণ। কিন্তু কোনো ভুল না করেও যখন কেউ পদে পদে ক্ষমা চাইতে থাকেন, তখন সেটি আর নিছক ভদ্রতার পর্যায়ে থাকে না। মনোবিজ্ঞান বলছে, এই অতিমাত্রায় দুঃখপ্রকাশ করার প্রবণতার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে মানুষের শৈশবের অভিজ্ঞতা, মানসিক চাপ কিংবা প্রত্যাখ্যানের গভীর কোনো ভয়।

অন্যকে অসন্তুষ্ট করার ভয়
অনেকেই ভাবেন, আগেভাগে ক্ষমা চেয়ে নিলে হয়তো সামনের মানুষটির রাগ বা বিরক্তি থেকে বাঁচা যাবে। কোনো দোষ না থাকলেও তারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বা সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব এড়ানোর জন্য পুরো দায় নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। ধরুন, খুব জরুরি একটি দরকারে কাউকে ডাকতে গিয়েও তারা বলে বসেন, আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। তারা মনে করেন, ক্ষমা না চেয়ে কথা শুরু করলেই হয়তো অপর পাশের মানুষটি রেগে যাবেন।

শৈশবের নেতিবাচক প্রভাব
মানুষের বর্তমান আচরণের অনেক কিছুরই শেকড় লুকিয়ে থাকে তার শৈশবে। ছোটবেলায় যদি কেউ এমন পরিবেশে বড় হন যেখানে কথায় কথায় দ্বন্দ্ব বা তিরস্কারের ভয় ছিল, তবে তারা নিজেদের সুরক্ষিত রাখার কৌশল হিসেবে ক্ষমা চাওয়াকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন। অবচেতনভাবেই তারা শিখে যান যে, সরি বললেই হয়তো সব ঝামেলা মিটে যাবে। আর এই অভ্যাসটিই তারা বয়ে বেড়ান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও।

আত্মবিশ্বাসের অভাব ও হীনম্মন্যতা
প্রয়োজন ছাড়াই বারবার ক্ষমা চাওয়ার অন্যতম বড় কারণ হলো নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের অভাব। এমন মানুষেরা প্রায়ই মনে করেন যে, তাদের কোনো কিছু চাওয়ার, সাহায্য প্রত্যাশা করার বা নিজস্ব মতামত দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। তাই তারা যখনই কারও কাছে সাহায্য চান, তখন এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন তারা অন্যের মূল্যবান সময় নষ্ট করে বিরাট কোনো অপরাধ করে ফেলছেন।

সবাইকে খুশি রাখার প্রবণতা
অনেকের ভেতরেই চারপাশের সবাইকে খুশি রাখার এক অদ্ভুত তাগিদ কাজ করে। তারা কখনোই কাউকে ‘না’ বলতে পারেন না এবং অন্যের চোখে নিজের ইতিবাচক ভাবমূর্তি ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। এই ধরনের মানুষেরা অকারণে ক্ষমা চান কেবল এটা নিশ্চিত করার জন্য যে, তাদের কোনো আচরণে যেন কেউ বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হন। কিন্তু একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ধরনের মানসিক চাপের কোনো স্থান নেই।

মানসিক উদ্বেগ বা অ্যাংজাইটি
অ্যাংজাইটি বা মানসিক উদ্বেগ মানুষকে অনেক বেশি আত্ম-সমালোচক করে তোলে। যাদের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করে, তারা সবসময়ই একটা কাল্পনিক আশঙ্কায় ভোগেন। তারা ধরে নেন, যেকোনো খারাপ পরিস্থিতির পেছনে হয়তো তাদেরই কোনো না কোনো ভুল রয়েছে। তাই নিজেকে মানসিকভাবে কিছুটা শান্ত রাখতে তারা বারবার ক্ষমা চাওয়ার এই কৌশলটি ব্যবহার করেন। এটি একপর্যায়ে তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়।

প্রত্যাখ্যাত হওয়ার গোপন ভয়
অনেকে শুধু এই ভেবেই নিজের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নেন যে, পরিস্থিতি খারাপ হলে হয়তো কাছের মানুষরা তাদের ছেড়ে চলে যাবে। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার তাগিদে এবং নিজেকে অন্যের চোখে নির্দোষ প্রমাণ করতেই তারা এই পথ বেছে নেন। অথচ একটি সুন্দর সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট মানুষের ওপর সব দায় বর্তায় না। সেখানে দুজনকেই সমানভাবে দায়িত্ব নিতে হয়।

সমাজ ও চারপাশের পরিবেশ
আমাদের অনেক আচরণই সমাজ ও চারপাশের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় অবচেতনভাবেই আমরা সমাজের শেখানো কিছু নিয়ম মেনে চলি, যেখানে হয়তো বিনয় দেখাতে গিয়ে আমরা নিজেদেরই ছোট করে ফেলি। নিজের ভুলের জন্য দায় নেওয়া বা ক্ষমা চাওয়া অবশ্যই দারুণ একটি গুণ। কিন্তু সমস্যাটি তখনই তৈরি হয়, যখন কোনো কারণ ছাড়াই অতিরিক্ত দুঃখপ্রকাশ করাটা মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়।

কীভাবে এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসবেন
যেকোনো সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হলো নিজের সমস্যাটি বুঝতে পারা। আপনি যদি খেয়াল করেন যে, অকারণে সরি বলা আপনার প্রতিদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তবে এখন সচেতন হওয়ার সময়। নিজের প্রয়োজনগুলোকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। পরিস্থিতি অনুযায়ী শব্দচয়নে পরিবর্তন আনুন। যেমন দেরি করে আসার পর দেরি হওয়ার জন্য সরি না বলে হাসিমুখে বলতে পারেন, আমার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। একইভাবে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত বলার বদলে সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারেন, আপনার কি এখন কথা বলার মতো একটু সময় হবে?

নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করা বা কারও কাছে সময় চাওয়া মোটেই অপরাধ নয়। ভুল করলে অবশ্যই আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে। তবে প্রতিটি পদক্ষেপে নিজেকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কোনো মানে নেই। ভারতের বেঙ্গালুরুর অ্যাপোলো হাসপাতালের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডা. সুগামী রমেশ মনে করেন, আত্মবিশ্বাসের অভাব বা অতিরিক্ত উদ্বেগ থেকে যদি এই আচরণ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে একজন থেরাপিস্ট বা মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। কোথায় আমাদের আসলেই ক্ষমা চাওয়া উচিত আর কোথায় নিজেদের দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকতে হবে, এই পার্থক্যটুকু বুঝতে পারাই সুন্দর ও প্রশান্তিময় জীবনের মূল চাবিকাঠি।

শুভ্র/