চুল পড়ার নেপথ্যে কি সত্যিই ঢাকার পানি?

তাহমিদা খানম:
ঢাকায় নতুন করে বসবাস শুরু করার পর অনেকেরই একটি সাধারণ অভিজ্ঞতা হয়—হঠাৎ করেই চুল আগের চেয়ে বেশি ঝরছে, রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে এবং মাথার ত্বক শুষ্ক লাগছে। চুল পড়া নিয়ে এই অভিযোগের তীর অবধারিতভাবেই ওঠে ঢাকার পানির দিকে। ব্যক্তিগত এই অভিজ্ঞতার কারণে অনেকেই মনে করেন, ঢাকার পানিতে নিশ্চয়ই এমন কিছু আছে যা চুল ও মাথার ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তো এক বিষয় নয়। তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, ঢাকার পানি এবং চুল পড়ার এই সম্পর্কের ভিত্তি আসলে কতটা সত্য?
পানিকে সরাসরি চুল পড়ার একমাত্র কারণ বলার মতো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো না থাকলেও বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। এখানে প্রথমেই আসে ‘কঠিন পানি’ বা হার্ড ওয়াটারের প্রসঙ্গ। পানিতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের মতো খনিজ উপাদানের পরিমাণ বেশি থাকলে তাকে কঠিন পানি বলা হয়। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কঠিন পানি চুলের ওপর খনিজের একটি আস্তরণ তৈরি করতে পারে। অন্য একটি গবেষণায় শক্ত পানির সংস্পর্শে চুলের টান সহ্য করার ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রমাণও মিলেছে। এর ফলে চুল রুক্ষ বা ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে কঠিন পানি সরাসরি চুলের গোড়া নষ্ট করে চুল পড়ায়—এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। এরপরও ঢাকার পানির কঠোরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েই যায়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মিরপুরের ছয়টি স্থান থেকে সংগ্রহ করা ভূগর্ভস্থ পানিতে কঠোরতার মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার অনেক ওপরে (প্রতি লিটারে ৩৩০ থেকে ৯০০ মিলিগ্রাম) পাওয়া গেছে। যদিও এটি পুরো ঢাকার চিত্র নয়, তবু এটি একটি বড় সতর্কবার্তা।
ঢাকার পানিতে শুধু খনিজ উপাদানের আধিক্য বা কঠোরতাই নয়, বড় উদ্বেগের জায়গা হলো দূষণ। ঢাকার ৩৫টি স্থান থেকে সংগ্রহ করা কলের পানির নমুনা নিয়ে করা একটি গবেষণায় পারদ, ম্যাঙ্গানিজ ও লোহার মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে মাতুয়াইল ও জুরাইন এলাকার পানিদূষণের মাত্রা ছিল বেশ উদ্বেগজনক। পানি শোধনাগার থেকে বের হওয়ার সময় নিরাপদ থাকলেও বাসাবাড়ির কল পর্যন্ত পৌঁছানোর দীর্ঘ পথে এর গুণগত মান মারাত্মকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। ২০১৯ সালের ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫১.৫ শতাংশ গ্রাহকই পানি অপরিষ্কার এবং ৪১.৪ শতাংশ দুর্গন্ধের কথা জানিয়েছিলেন। পুরোনো পাইপলাইন, পাইপের লিকেজ ও বাসাবাড়ির অপরিষ্কার পানির ট্যাংক সম্ভাব্য দূষণের অন্যতম উৎস। ২০২২ সালে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালকও পুরোনো পাইপের লিকেজের কারণে দূষণের কথা স্বীকার করে পানি ফুটিয়ে পানের পরামর্শ দিয়েছিলেন। সর্বশেষ ২০২৫ সালেও মিরপুর, আগারগাঁও, রামপুরা, মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় দুর্গন্ধযুক্ত ও ঘোলা পানি পাওয়ার অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
তবে চুল পড়ার সব দায় এককভাবে পানির ওপর চাপানো বৈজ্ঞানিকভাবে পুরোপুরি যৌক্তিক নয়। একজন মানুষ যখন ঢাকায় আসেন, তখন তার খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, মানসিক চাপ, ব্যবহৃত প্রসাধনী এবং সামগ্রিক জীবনযাপনের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। বংশগত প্রবণতা, পুষ্টির ঘাটতি, হরমোনের পরিবর্তন, শারীরিক অসুস্থতা বা মাথার ত্বকের সমস্যার মতো বিষয়গুলোও চুল পড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। তাই শুধু সময়ের মিল দেখে পানিকে একমাত্র অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। আবার চুল পড়ার এই ব্যাপক অভিযোগকে নিছক কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেওয়ারও অবকাশ নেই।
প্রকৃতপক্ষে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার পানির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং সেসব এলাকার মানুষের চুল পড়ার মাত্রার মধ্যে সরাসরি কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে একটি সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এলাকার পানির নমুনা পরীক্ষা এবং মানুষের জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যগত দিকগুলো পর্যবেক্ষণ করলেই এর প্রকৃত উত্তর মিলবে। তার আগে প্রয়োজন এলাকাভিত্তিক, নিয়মিত ও প্রকাশ্য পানির মান পরীক্ষা নিশ্চিত করা। কারণ যে পানি আমরা পান করি, সেই পানি দিয়েই প্রতিদিন মুখ ধুই এবং গোসল করি। আর হয়তো চুল পড়ার এই আপাত ছোট অভিযোগটিই আমাদের সামনে একটি অনেক বড় ও গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে—ঢাকা কি আমাদের স্রেফ পানি দিচ্ছে, নাকি প্রতিনিয়ত কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
শুভ্র/