দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্যহীন সমাজ, শিক্ষার্থীদের চোখে উত্তরণের পথ

দারিদ্র্য কেবল বার্ষিক আয়ের কোনো হিসাব বা অর্থনৈতিক সূচক নয়, এটি মূলত বেঁচে থাকার মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার এক চরম বাস্তবতা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও নিরাপদ জীবনের সুযোগ থেকে ছিটকে পড়া কোটি কোটি মানুষের দিনবদলের বার্তা নিয়ে প্রতিবছর ১৭ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। দিবসটি উপলক্ষে দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেছেন ইডেন মহিলা কলেজের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা। মতামতগুলো গ্রন্থনা করেছেন বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরামের ইডেন মহিলা কলেজ শাখার প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক শাম্মী শফিক জুঁই।
টেকসই উন্নয়নের পথে প্রধান বাধা দারিদ্র্য ও বৈষম্য
দারিদ্র্য ও বৈষম্য টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী বিশ্বের প্রায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ চরম দারিদ্র্যে রয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বে ২৮০ কোটির বেশি মানুষ আবাসনসংকটে রয়েছে। দারিদ্র্যের কারণে মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হয়। বৈষম্যের ফলে সম্পদ ও সুযোগের সুষম বণ্টন বাধাগ্রস্ত হয়। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানবসম্পদের উন্নয়ন ব্যাহত হয়। টেকসই উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি সামাজিক সমতা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার প্রথম লক্ষ্য দারিদ্র্য নিরসন। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব দিতে হবে। দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলেই গড়ে উঠবে টেকসই, সমতাভিত্তিক ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ।
– নাজিয়া তাবাসসুম, শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (ইডেন ক্যাম্পাস)।
দারিদ্র্য দূরীকরণে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিকল্প নেই
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো দারিদ্র্য। জনসংখ্যার তুলনায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। শিক্ষার মাধ্যমে দারিদ্র্য অনেকাংশে হ্রাস করা সম্ভব। প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা প্রদান করলে শিক্ষার্থীরা দক্ষ ও স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। কর্মমুখী শিক্ষা তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা পেলে তরুণেরা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে। তারা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে যা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। এ ছাড়া দক্ষ জনশক্তিকে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিলে তারা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। তাই দারিদ্র্য দূরীকরণ, বেকারত্ব হ্রাস এবং দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে মানসম্মত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিকল্প নেই।
– নাসরিন আক্তার, শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (ইডেন ক্যাম্পাস)।
ক্ষুধা ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার
দারিদ্র্য কেবল অর্থের অভাব নয়, এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, পুষ্টি ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এসব মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গড়তে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সম্পদের সুষম বণ্টন, টেকসই কর্মসংস্থান এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। ধনী দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিতকরণ জরুরি। বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব ও আয়বৈষম্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানসম্মত শিক্ষা, সুলভ চিকিৎসা এবং সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় করা দরকার। দারিদ্র্য বিমোচন কেবল সরকারি দায়িত্ব নয়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
– জান্নাত বুলবুল পৌষি, শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভেঙে হোক সমৃদ্ধির সূচনা
একটি দেশে যখন দারিদ্র্য উত্তরাধিকারসূত্রে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয় এবং তা থেকে মুক্তি পেতে বাধা দেয়, তখন এটি দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র নামে পরিচিতি লাভ করে। জীবনধারণের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, নিরাপদ বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা পূরণ সম্ভব হলেই তবে সেখানে দারিদ্র্য বিমোচন হয়। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে নিরাপদ খাদ্য এবং চিকিৎসা নিশ্চিতে গঠনমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। একটি অনুন্নত দেশ শিক্ষা এবং দক্ষতার মাধ্যমেই দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছাতে পারে। শিক্ষার পাশাপাশি একটি জাতিকে দক্ষতার সঙ্গে জনশক্তিতে রূপান্তর করাও জরুরি। উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষ করে এশিয়া মহাদেশীয় দেশগুলোকে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের করে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে আয় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে নিম্ন আয় ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় সর্বাধিক। একটি দেশের দারিদ্র্য দূর করতে সর্বপ্রথম প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কর্মহীন হতদরিদ্র মানুষের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে যেখান থেকে তারা সঞ্চয় ও পুঁজি সৃষ্টি করতে পারে। এতে আয় বৃদ্ধির পথ উন্মুক্ত হবে। মাতৃস্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমেই দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
– জাকিয়া সুলতানা, শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।
সবার জন্য সমান সুযোগ: দারিদ্র্য বিমোচনের নতুন পথ
দারিদ্র্য বিমোচন শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমেও দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব। সমাজের প্রতিটি মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও মৌলিক অধিকার পাওয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। কিন্তু অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, মানসম্মত শিক্ষার অভাব এবং সামাজিক অবিচার অনেক মানুষকে দারিদ্র্যের চক্রে আটকে রাখে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং ন্যায্য কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। দারিদ্র্য বিমোচন কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। মনে রাখতে হবে দারিদ্র্য বিমোচন মানে শুধু অর্থের অভাব দূর করা নয়, বরং মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও আত্মনির্ভরতা নিশ্চিত করা। সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলেই গড়ে উঠবে বৈষম্যহীন, সমৃদ্ধ ও মানবিক সমাজ।
– মাগফেরা আখতার, শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (ইডেন ক্যাম্পাস)।