এক জাদুকরী মাছরাঙার গল্প

প্রকৃতির বিশাল পৃথিবীতে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা মানুষের জীবন ও চিন্তাধারাকে পুরোপুরি বদলে দেয়। কখনো কখনো একটি মাত্র পাখিই পারে কারও হৃদয়কে অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে দিতে এবং প্রকৃতির প্রতি এক গভীর ভালোবাসার জন্ম দিতে। প্রকৃতিবিষয়ক লেখালেখিতে প্রায়ই এমন সব জীবন বদলে দেওয়া পাখির কথা উঠে আসে, যাদের ভালোবেসে ‘স্পার্ক বার্ড’ বা অনুপ্রেরণাদায়ী পাখি বলা হয়। একজন প্রকৃতিপ্রেমীর কাছে এই জাদুকরী ভূমিকা পালন করেছিল বেশ সাধারণ তবে মোহনীয় গড়নের একটি পাখি, যার নাম সেক্রেড কিংফিশার বা পবিত্র মাছরাঙা।
মাছরাঙা নাম শুনলেই সাধারণত মাছ শিকারের দৃশ্য কল্পনায় আসে। তবে অস্ট্রেলিয়ার বেশির ভাগ মাছরাঙাই ঐতিহ্যবাহী এই নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। খাঁটি মাছরাঙারা মূলত জলাভূমি, বাঁধ বা ছোট নদীর আশপাশে বংশবিস্তার করলেও কুরিলপা উপদ্বীপের মতো এলাকায় এদের দেখা মেলা ভার। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সেক্রেড কিংফিশারদের সারা বছরই এখানে দেখা যায়। সামান্য নাদুসনুদুস শরীর, লম্বা চঞ্চু এবং ছোট পায়ের এই পাখিটির চেহারা বেশ মায়াবী। এদের পিঠ ও মাথায় থাকে উজ্জ্বল নীলচে-সবুজ রঙের আভা এবং গলা থেকে বুক পর্যন্ত থাকে সাদা বা হালকা বাদামি রঙের পালক। মাথার নীলচে অংশটিকে শরীর থেকে আলাদা করেছে চমৎকার একটি সাদা কলার। চোখের ওপর দিয়ে একটি গাঢ় রেখা সোজা চঞ্চু পর্যন্ত চলে গেছে, আর তার ঠিক ওপরেই রয়েছে হালকা রঙের একটি ভ্রু। জলাশয়ের ওপর ঝুঁকে থাকা ডালে বসে এরা অদ্ভুত সুন্দর ভঙ্গিতে মাথা ওপর-নিচ করে এবং পরক্ষণেই ম্যানগ্রোভ এলাকার কাঁকড়া, ছোট মাছ বা টিকটিকি শিকারের জন্য তীব্র বেগে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
এমনিতে এরা বেশ শান্ত স্বভাবের হলেও প্রজনন মৌসুমের আগে ও চলাকালীন সময়ে এদের রূপ বদলে যায়। তখন এরা অনেকটা মেশিনগানের গুলির মতো একটানা ‘কিক-কিক-কিক’ শব্দে চারপাশ মুখর করে তোলে। বাসা বানানোর ক্ষেত্রেও এরা বেশ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। নদীর খাড়া পাড়ে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে, উঁচু গাছের উইপোকার ঢিবিতে কিংবা বয়স্ক গাছের কোটরে এরা বাসা বাঁধে এবং তিন থেকে ছয়টি ডিম পাড়ে। ছোট নদীগুলোতে অনেক সময় ছানাদের বড় করার জন্য পর্যাপ্ত খাবার থাকে না। তাই প্রজনন মৌসুমে কিছু পাখি খাবারের সন্ধানে গভীর ঝোপঝাড়ে পাড়ি জমায়। তবে ব্রিসবেন নদীর আশপাশের এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাবার থাকায় বেশ কিছু জোড়া পাখি এখানেই নিশ্চিন্তে বংশবিস্তার করতে পারে।
কুরিলপা উপদ্বীপ থেকে শুরু করে সাউথ ব্যাংক এবং ডাউফিন টেরেজ পর্যন্ত কাদামাটি, ঝুঁকে থাকা গাছের ডাল বা ভাসমান পন্টুন থেকে এই পাখিদের শিকার করার দৃশ্য সত্যিই মনোরম। বসন্তের চমৎকার দিনে এই নীল ডানার ঝলকানি আর তাদের প্রাণবন্ত ডাক প্রকৃতিপ্রেমীদের মনকে মুহূর্তেই সতেজ করে দেয়। প্রকৃতির এই ছোট অথচ অপরূপ প্রাণীগুলো শুধু আমাদের চারপাশকেই সুন্দর রাখে না, বরং বারবার মনে করিয়ে দেয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব। এই ধরনের পাখির হাত ধরেই হয়তো ভবিষ্যতের অসংখ্য মানুষ প্রকৃতির খুব কাছাকাছি যাওয়ার অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবে।