মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

হরমোনজনিত ব্যাধি পিসিওএস: শারীরিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয়

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

পিসিওএস বা পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম হলো নারীদের একটি সাধারণ হরমোনজনিত ও বিপাকীয় ব্যাধি, যা প্রজননক্ষম বয়সে ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক কার্যকলাপকে প্রভাবিত করে। একে বর্তমানে পিওএমএস বা পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোমও বলা হয়। এই সমস্যায় শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ১৯৩৫ সালে পিসিওএস একটি সুনির্দিষ্ট রোগলক্ষণ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিস এমন কিছু নারীর বর্ণনা দিয়েছিলেন, যাঁদের মাসিক বন্ধ ছিল এবং ত্বক ছিল তৈলাক্ত ও পুরু। পরবর্তী সময়ে বন্ধ্যাত্বে আক্রান্ত নারীর ডিম্বাশয় পর্যবেক্ষণ করে সেটিকে উজ্জ্বল ও পায়রার ডিমের মতো সাদা বলে বর্ণনা করা হয়। ১৮৪৪ সালে ফরাসি চিকিৎসক আশিল শেরো প্রথম ডিম্বাশয়ের এই সিস্ট বা থলিসদৃশ পরিবর্তনকে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করেন।

১৯৩৫ সালে মার্কিন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ড. আরভিং এফ স্টেইন এবং ড. মাইকেল এল লেভেনথাল প্রথম প্রমাণ করেন যে নারীদের এই ভিন্ন ভিন্ন শারীরিক সমস্যাগুলো আসলে একটি নির্দিষ্ট সিন্ড্রোমের অংশ। তাঁরা সাতজন নারীর ওপর গবেষণা চালান, যাঁদের প্রধান তিনটি সমস্যা ছিল অনিয়মিত বা বন্ধ মাসিক, শরীরে অতিরিক্ত লোম গজানো এবং ডিম্বাশয় আকারে বড় হয়ে যাওয়া। তাঁরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দেখেন যে এই নারীদের ডিম্বাশয়ের চারপাশে ছোট ছোট অসংখ্য তরলপূর্ণ থলি বা ফলিকল জমে আছে। এই যুগান্তকারী গবেষণাপত্রটি প্রকাশের পর চিকিৎসকদের নামানুসারে দীর্ঘ সময় ধরে রোগটিকে ‘স্টেইন ও লেভেনথাল সিন্ড্রোম’ বলা হতো। পরবর্তী সময়ে ডিম্বাশয়ের গঠনগত রূপ দেখে এর নাম দেওয়া হয় পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম বা পিসিওএস।

কেন হয় এবং শারীরিক লক্ষণ কী?

পিসিওএসের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। আক্রান্ত নারীদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বা তারও বেশি মানুষের এই সমস্যাটি থাকে। আমাদের শরীর খাবার থেকে শক্তি তৈরির জন্য ইনসুলিন হরমোন ব্যবহার করে। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হলে শরীরের কোষগুলো এই হরমোনকে সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না। ফলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। এই অতিরিক্ত ইনসুলিন ডিম্বাশয়কে উদ্দীপিত করে, যার ফলে ডিম্বাশয় থেকে পুরুষ হরমোন বা অ্যান্ড্রোজেন অতিরিক্ত মাত্রায় তৈরি হতে শুরু করে।

অ্যান্ড্রোজেন সাধারণত পুরুষ হরমোন হলেও নারীদের শরীরে সামান্য পরিমাণে থাকে। পিসিওএস হলে ডিম্বাশয় থেকে অতিরিক্ত অ্যান্ড্রোজেন নিঃসৃত হয়, যা ডিম্বস্ফুটন বা ডিম্বাণু বড় হতে বাধা দেয়। এই হরমোন বেড়ে যাওয়ার কারণে ত্বকে এবং চুলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে। মুখমণ্ডল, বিশেষ করে থুতনি ও ঠোঁটের ওপরে এবং বুক, পেট, পিঠ কিংবা উরুতে পুরুষদের মতো ঘন ও মোটা লোম গজাতে শুরু করে। অতিরিক্ত হরমোনের কারণে ত্বকে তেল নিঃসরণ বেড়ে যায়, ফলে তীব্র ব্রণ বা ফুসকুড়ি হয় যা সহজে কমতে চায় না। মাথার সামনের ও মাঝখানের অংশের চুল পাতলা হয়ে ঝরতে শুরু করে। এ ছাড়া পেটের অংশে চর্বি জমে এবং নিয়মিত খাবার নিয়ন্ত্রণ বা ব্যায়াম করার পরও ওজন কমানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব

পিসিওএস কেবল একটি শারীরিক সমস্যা নয়, এটি একজন নারীর মানসিক ও সামাজিক জীবনের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে মেজাজের ঘন ঘন পরিবর্তন বা মুড সুইং অত্যন্ত তীব্র হতে পারে। হরমোনের অস্বাভাবিক ওঠানামা এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের কারণে মস্তিষ্কের রাসায়নিক উপাদানগুলোতে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। কোনো দৃশ্যমান কারণ ছাড়াই মনের ভাব দ্রুত পরিবর্তিত হয়। এই হয়তো খুব হাসিখুশি বা স্বাভাবিক আছেন, তার ঠিক কয়েক মিনিট পরেই তীব্র রাগ, বিরক্তি বা কান্না চলে আসতে পারে। আশপাশের মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারেন না কেন এমন আচরণ হচ্ছে।

পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বা সাধারণ বিষয় নিয়ে সারাক্ষণ একটা অজানা ভয় ও দুশ্চিন্তা কাজ করে। বুক ধড়ফড় করা, হাত ও পা কাঁপা কিংবা প্যানিক অ্যাটাকের মতো লক্ষণও দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে নিজের শারীরিক পরিবর্তন যেমন ওজন বৃদ্ধি, মুখে লোম বা ব্রণ নিয়ে তীব্র হীনমন্যতা ও উদ্বেগ তৈরি হয়।

প্রতিরোধ ও উত্তরণে করণীয়

আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রজননক্ষম বয়সের নারীদের মধ্যে পিসিওএসের প্রাদুর্ভাব প্রায় ৮ থেকে ১৩ শতাংশ। সাধারণ হিসাবে প্রতি দশজনে একজন এবং কিছু অঞ্চলের সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রতি আটজনে একজন নারী এই সমস্যায় ভুগছেন। তাই তাঁদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

  • পরিবারের ভূমিকা: এই রোগে দ্রুত ওজন বাড়ে এবং মুখে ব্রণ ও অবাঞ্ছিত লোম গজায়। পরিবারের সদস্যদের উচিত আক্রান্ত নারীকে তাঁর চেহারা বা ওজন নিয়ে কটূক্তি না করে মানসিক সাহস জোগানো এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ানো। এ ছাড়া পিসিওএস নিয়ন্ত্রণে খাবার নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে জরুরি। কেবল আক্রান্ত নারীর জন্য আলাদা খাবার না বানিয়ে পুরো পরিবারের উচিত একসঙ্গে পুষ্টিকর ও কম শর্করার স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস করা।

  • সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: অনেক সময় অনিয়মিত মাসিক বা বন্ধ্যাত্বকে আমাদের সমাজে নানা রকম কুসংস্কারের সঙ্গে জড়ানো হয়। সমাজকে বুঝতে হবে এটি সম্পূর্ণ একটি চিকিৎসাগত জটিলতা, কোনো সামাজিক অপরাধ বা অভিশাপ নয়।

  • রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ: সরকারি উদ্যোগে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গণমাধ্যমে পিসিওএস ও নারীদের হরমোনজনিত স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা উচিত, যাতে কিশোরীরা শুরুতেই লক্ষণগুলো চিনতে পারে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টিফিনে জাঙ্ক ফুড বা ফাস্ট ফুড নিষিদ্ধ করা এবং ছাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক দৈনিক খেলাধুলা বা শারীরিক ব্যায়ামের অবকাঠামো তৈরি করা রাষ্ট্রের একটি বড় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হতে পারে।

সর্বোপরি, অজ্ঞতা ও অবহেলা দূর করে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সচেতন জীবনযাপনের মাধ্যমেই এই রোগের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।