সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

সাংকেতিক ভাষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ নিজের ভাব প্রকাশ ও পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি ও ইশারা ব্যবহার করে আসছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ভাষার বিকাশ ঘটলেও সাংকেতিক ভাষার প্রয়োজনীয়তা আজও অটুট। আমাদের সমাজে শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য সাংকেতিক ভাষা ভাব প্রকাশ ও যোগাযোগের একটি প্রধান মাধ্যম। সাংকেতিক ভাষার স্বীকৃতি, অধিকার, সমতা ও ব্যবহার নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন ইডেন মহিলা কলেজের একদল শিক্ষার্থী। মতামতগুলো গ্রন্থনা করেছেন একই কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ সুলতানা মীম।

সাংকেতিক ভাষার স্বীকৃতি ও অধিকার
– আকিলা আনিস, শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ।

সাংকেতিক ভাষার অপর নাম ইশারা ভাষা। এটি শুধু কথা বলার একটি বিকল্প মাধ্যম নয়, বরং শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষা, যোগাযোগ, আত্মপ্রকাশ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম হাতিয়ার। ২০০৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলা ইশারা ভাষাকে অন্যতম দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সাল থেকে প্রতিবছর ৭ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলা ইশারা ভাষা দিবস পালন করা হচ্ছে। এ ছাড়া জাতিসংঘ প্রতিবছর ২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাংকেতিক ভাষা দিবস পালন করে। পরিবার, সমাজ, কর্মক্ষেত্র এবং রাষ্ট্রের সব জায়গায় সাংকেতিক ভাষা ব্যবহারের স্বীকৃতি এবং অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। কেউ যেন শুধু ভাষাগত বাধার কারণে শিক্ষা ও চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। কারণ সমাজের কোনো একটি অংশ পিছিয়ে থাকলে দেশ তার কাঙ্ক্ষিত সাফল্যে পৌঁছাতে পারবে না। তাই শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধীদের সাংকেতিক ভাষাকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দিতে হবে।

সাংকেতিক ভাষা: সমতার পথে এক সেতুবন্ধ
– খাদিজা আক্তার, শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ।

মানুষের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হলো ভাষা। আমাদের দেশে বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী অনেক মানুষ রয়েছেন, যাঁরা প্রচলিত ভাষায় নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেন না। তাই তাঁরা হাতের ইশারা, মুখভঙ্গি ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করেন, যা সাংকেতিক ভাষা নামে পরিচিত। সাংকেতিক ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি সমতা প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। একজন বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশু যখন তার নিজস্ব ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়, তখন তার প্রতিভা বিকাশের পথ আরও সুগম হয়। একইভাবে সাংকেতিক ভাষার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্র, হাসপাতাল ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাদের অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের দেশে সাংকেতিক ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তাই বিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এই ভাষা শেখার সুযোগ বাড়াতে হবে। এর মাধ্যমেই সমাজে প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে।

কণ্ঠের সীমা পেরিয়ে ভাষার স্বাধীনতা
– আনিছা খাতুন, শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ।

ভাষা কেবল উচ্চারিত শব্দে সীমাবদ্ধ নয়। মনের ভাব প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা কণ্ঠের সীমা পেরিয়ে নানা রূপ ধারণ করে। ইশারা, অঙ্গভঙ্গি, প্রতীক, দিকনির্দেশনামূলক ফলক এবং ব্রেইলের মতো বিভিন্ন মাধ্যম সর্বজনীন যোগাযোগের ক্ষেত্রে মানুষের অনুভূতি ও প্রয়োজন প্রকাশে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এটি সামাজিক বৈষম্যকে ছাপিয়ে সব ক্ষেত্রে সর্বসাধারণের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে। সাংকেতিক ভাষা শুধু কথার বিকল্প নয়; এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক অংশগ্রহণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। এই ভাষা সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যহীন পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব। ভাষার স্বাধীনতা মানে শুধু কথা বলার অধিকার নয়, প্রত্যেক মানুষের নিজের ভাব প্রকাশ ও অন্যের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার অধিকার। কণ্ঠ থেমে গেলেও ভাষা কখনো থেমে থাকে না। তাই সাংকেতিক ভাষা কণ্ঠের সীমা পেরিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করার স্বাধীনতারই সুদৃঢ় প্রকাশ।

হাতের ইশারায় হৃদয়ের ভাষা
– সাবনীহা ইয়াছমিন, শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ।

সব মানুষ শব্দের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেন না। শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধী মানুষেরা হাতের ইশারা, আঙুলের ভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি ও শরীরের নড়াচড়ার মাধ্যমে নিজেদের অনুভূতি, প্রয়োজন ও চিন্তা প্রকাশ করেন। এই ইশারাগুলোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সাংকেতিক ভাষা। এর মাধ্যমে তাঁরা আনন্দ, দুঃখ, ভালোবাসা, অভিমান, কষ্ট কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনের কথা জানান। হাতের প্রতিটি ভঙ্গি ও ইশারা যেন তাঁদের মনের ভাষা, যেখানে শব্দ নেই কিন্তু অনুভূতির কোনো অভাব নেই। তাই সাংকেতিক ভাষা শুধু হাত নাড়ানোর বিষয় নয়, এটি ভাব প্রকাশের একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র মাধ্যম। আমাদের সমাজে এখনো এই ভাষার ব্যবহার ও পরিচিতি সীমিত। তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এর চর্চা চালু করা প্রয়োজন। কারণ ভাষা শুধু মুখের শব্দে প্রকাশ পায় না, হাতের ইশারাতেও হৃদয়ের কথা বলা যায়।

নীরবতা নয়, যোগাযোগের অধিকার
– নাফিছা তাবাচ্ছুম, শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ।

একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজ কখনোই নীরবতার সংস্কৃতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, বরং তা গড়ে ওঠে অবাধ ও নিরাপদ যোগাযোগের চর্চার মধ্য দিয়ে। অথচ শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধীসহ বহু মানুষ এখনো নিজের কথা, অনুভূতি ও প্রয়োজন যথাযথভাবে প্রকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তাঁদের জন্য সাংকেতিক ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং নিজের পরিচয় ও অধিকার প্রকাশের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু এই ভাষা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা তাঁদের স্বাভাবিক যোগাযোগের পথে বাধা সৃষ্টি করে। অথচ যোগাযোগের অধিকার সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। একজন মানুষ শব্দের মাধ্যমে কথা বলুক কিংবা সংকেতের মাধ্যমে, তার বক্তব্যের মূল্য ও মর্যাদা সমান। তাই সাংকেতিক ভাষার ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো সময়ের দাবি। নীরবতা চাপিয়ে নয়, প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব ভাষা ও যোগাযোগপদ্ধতিকে সম্মান করেই গড়ে তুলতে হবে একটি মানবিক সমাজ।