রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে এগিয়ে যাক কন্যাশিশু

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

কন্যাশিশু আমাদের সমাজের আশীর্বাদস্বরূপ। তাদের অদম্য মনোবল, ধৈর্য, বুদ্ধি এবং সক্ষমতা সমাজ ও দেশের উন্নতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। তাই তাদের প্রতি বৈষম্য বা অবহেলা না করে সমতা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। আজ আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে কন্যাশিশুদের প্রতিবন্ধকতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন ইডেন মহিলা কলেজের একদল শিক্ষার্থী। মতামতগুলো গ্রন্থনা করেছেন একই কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শেখ সুলতানা মীম।

কন্যাশিশু হোক সম্ভাবনার প্রতীক: বৈষম্যের নয়

কন্যাশিশু মানেই কারও বোঝা নয়, সে হলো সম্ভাবনার নাম। জন্মের পর থেকেই যদি তাকে মেয়ে হয়েছে বলে আফসোস করা হয়, স্কুলের বদলে রান্নাঘর দেখানো হয় এবং ছেলের সঙ্গে বৈষম্য করা হয়, তাহলে আমরা একটি জাতির অর্ধেক শক্তিকে নিজেরাই পিছিয়ে দিচ্ছি। একটি মেয়ে শিক্ষা পেলে সে শুধু নিজে এগোয় না, পুরো পরিবার আর সমাজকে এগিয়ে নেয়। সে হতে পারে চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক কিংবা উদ্যোক্তা। কিন্তু খাবার, পোশাক, পড়াশোনা আর নিরাপত্তার বেলায় ছোট ছোট বৈষম্যগুলো তার স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়। একটি জাতির উন্নতির পেছনে নারীদের অবদান অতুলনীয়। তারা একই সঙ্গে ঘরে এবং বাইরে সমানতালে কাজ করার ক্ষমতা রাখে। তাই আজকের দিনে আমাদের শপথ হোক, মেয়েকে বোঝা ভাবব না বরং সুযোগ দেব। কারণ কন্যাশিশু মানে অন্ধকার নয়, কন্যাশিশু মানে আলো, যে পারে একটি জাতিকে আলোয় ভরিয়ে দিতে এবং শিক্ষিত ও সভ্য সমাজ উপহার দিতে।

– উম্মে হাবিবা শান্তা, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ।

শিক্ষার আলোয় বদলে যাক কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ

শিক্ষার শুভ্র আলোয় দীপ্ত হয়ে উঠুক প্রতিটি কন্যাশিশুর কোমল পদচারণ। কারণ তাদের বিকশিত মেধা আর সুপ্ত সম্ভাবনার মাঝে লুকিয়ে আছে এক সমৃদ্ধ ও মানবিক সমাজ গড়ার অদম্য শক্তি। একটি কন্যাশিশুকে সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত করা মানে কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখা নয়, বরং তার অন্তরে আত্মবিশ্বাসের প্রদীপ জ্বেলে দেওয়া, যাতে সে আপন যোগ্যতায় সব অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। অজ্ঞতা আর কুসংস্কারের আঁধার পেরিয়ে যখন একটি মেয়ে আলোর ঝরনাধারায় পা বাড়ায়, তখন সে কেবল নিজের জীবনকেই বদলে দেয় না, পুরো পরিবার ও দেশের প্রগতির দিশারি হয়ে ওঠে। বাল্যবিবাহের অভিশাপ আর সামাজিক শিকল ভেঙে আজকের কন্যাসন্তান যখন স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে ডানা মেলে, তখন শিক্ষাই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে শক্তিমান হাতিয়ার। তাই আমরা সব সংকীর্ণতা ভুলে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিই এবং প্রতিটি কন্যাশিশুর হাতে তুলে দিই শিক্ষার প্রজ্বলিত মশাল, যেন তাদের ছড়ানো আলোয় বিশ্বমঞ্চে রচিত হয় এক বৈষম্যহীন ও সম্ভাবনাময় নতুন প্রভাত।

– কানিজ সুবর্ণা বাবলি, শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ।

কন্যাশিশুর বেড়ে ওঠা: স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও অধিকার

একটি সুন্দর সমাজ গঠনে কন্যাশিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের পর থেকেই একটি কন্যাশিশুর শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য অধিকার পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। তার নিজের মতামত প্রকাশ ও স্বপ্ন পূরণের স্বাধীনতাও প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনো অনেক কন্যাশিশু বৈষম্য, বাল্যবিবাহ ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়। অনেক পরিবারে ছেলেদের পড়াশোনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, আর মেয়েদের ঘরের কাজ শেখার জন্য চাপ দেওয়া হয়। আবার নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক মেয়েকে একা বাইরে যেতে বা নিজের পছন্দমতো পড়াশোনা করতেও বাধা দেওয়া হয়। এসব কারণে তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হয়। একটি কন্যাশিশুকে নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ দিতে হবে। তার মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বৈষম্য না করে দুজনকেই সমান সুযোগ দেওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে, আজকের কন্যাশিশুই আগামী দিনের নারী। তাই তাদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

– মুন্নি আক্তার নিশা, শিক্ষার্থী, ব্যবস্থাপনা বিভাগ।

শৈশব যখন বন্দী বাল্যবিবাহের বেড়াজালে

মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় হলো শৈশব। এ সময় শিশুরা নতুনকে জানতে শেখে এবং নতুন স্বপ্ন দেখে। কিন্তু নতুনকে জানা ও স্বপ্ন পূরণের আগেই কন্যাশিশুদের জীবনে নেমে আসে বাল্যবিবাহ নামক অন্ধকার অভিশাপ। বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি, যা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে আছে। অল্প বয়সে তরুণীদের বিয়ের ফলে তাদের শিক্ষা ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এই অভিশাপ তাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও এগিয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়। শিশুরা জীবনের লক্ষ্য স্থির করা ও নিজেকে গড়ে তোলার আগেই বাল্যবিবাহ তাদের দমিয়ে দেয়। কিশোরীরা এই ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী, নারীদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর ও ছেলেদের ২১ বছর। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক মেয়েরই ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যায়। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কন্যাশিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। তাই তাদের অন্ধকারে ঠেলে না দিয়ে বাল্যবিবাহকে না বলতে হবে এবং তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে।

– খাদিজা আক্তার, শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ।

গ্রাম থেকে শহর: কন্যাশিশুর স্বপ্ন ও সংগ্রামের গল্প

একটি ছেলেশিশুর তুলনায় একটি কন্যাশিশুর গ্রাম থেকে শহরে এসে নিজেকে গড়ে তোলার স্বপ্নটা তুলনামূলক অনেক বেশি কঠিন। একটি মেয়ে জন্মের পর থেকেই অনেক বাধার সম্মুখীন হয়। কখনো পারিবারিক অনুশাসনের, কখনো সামাজিক সংকীর্ণতার, আবার কখনো অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী গ্রামে থাকে, যারা সামাজিক বাধার শিকার হয়ে নিজেদের যোগ্যতা ও মেধা প্রমাণ করার পরিবেশ বা সুযোগ সুবিধা পায় না। কেউ উচ্চশিক্ষিত হতে চায়, কেউ নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়, আবার কেউ চায় পরিবার ও সমাজের প্রচলিত ধারণা ভেঙে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিতে। কিন্তু শহরের সুযোগ সুবিধার হাতছানি থাকলেও সবার জন্য সেই পথ মসৃণ থাকে না। অর্থের অভাব, নিরাপদ আবাসনের সংকট, যাতায়াতের অনিশ্চয়তা, সামাজিক কটূক্তি এবং পারিবারিক বাধা সব মিলিয়ে তাদের পথ হয়ে ওঠে কঠিন। সে জন্য রাষ্ট্র এবং প্রশাসনকে একযোগে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, নিরাপদ আবাসন ও কর্মপরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। একটি মেয়ের স্বপ্ন কখনো তার জন্মস্থান, পারিবারিক আর্থিক অবস্থা কিংবা সমাজের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কাছে পরাজিত হতে পারে না। প্রতিটি কন্যাশিশুর প্রাপ্য এমন একটি পৃথিবী, যেখানে তার পরিচয় কেবল মেয়ে হিসেবে নির্ধারিত হবে না, বরং মূল্যায়িত হবে তার মেধা, যোগ্যতা ও মানবিক গুণাবলির ভিত্তিতে।

– উম্মুল খায়ের সুমাইয়া, শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ।