কন্যাশিশু কোনো বোঝা নয়, অদম্য সম্পদ

একটি কন্যাসন্তানের জন্ম মানে শুধু নতুন কোনো প্রাণের আগমন নয়, একটি পুরো আগামীর অঙ্কুরোদ্গম। তার স্বপ্নগুলো যখন ডানা মেলে, তখন বদলে যায় পরিবারের গল্প, বদলে যায় একটি দেশের মানচিত্র। আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, এটি প্রতিটি কন্যাসন্তানকে নির্ভীকভাবে বেড়ে ওঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার দিন। শিকল ভাঙার গান গেয়ে তারা যেন নিজের আলোয় আলোকিত করতে পারে বিশ্বকে, আজ সেই প্রত্যয় ব্যক্ত করার দিন। আজ ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যা শিশু দিবস উপলক্ষে মানসিক ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেছেন ইডেন মহিলা কলেজের একদল শিক্ষার্থী। মতামতগুলো গ্রন্থনা করেছেন বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরামের ইডেন মহিলা কলেজ শাখার প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক শাম্মী শফিক জুঁই।
ভেঙে ফেলুক বাধা, বাড়ুক কন্যাশিশু
একটি কন্যাশিশুর জন্ম মানেই একটি নতুন সম্ভাবনার সূচনা। অথচ আজও সমাজের নানা কুসংস্কার, বৈষম্য ও অবহেলা তার বেড়ে ওঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কোথাও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, কোথাও বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে থেমে যায় তার স্বপ্নের পথচলা। অথচ উপযুক্ত শিক্ষা, পুষ্টি, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা পেলে একটি কন্যাশিশুও হয়ে উঠতে পারে দেশের উন্নয়নের শক্তি। বাংলাদেশ নারীশিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নে এগিয়ে থাকলেও বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও লিঙ্গবৈষম্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। কন্যাশিশুকে বোঝা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগে নিশ্চিত করতে হবে তার অধিকার ও বিকাশের সুযোগ। প্রতিটি কন্যাশিশু বেড়ে উঠুক নিজের স্বপ্ন পূরণের স্বাধীনতা নিয়ে। ভেঙে যাক বৈষম্যের দেয়াল, বাড়ুক কন্যাশিশু সম্ভাবনাময় আগামীর পথে। তবেই গড়ে উঠবে সমতাভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
— নাজিয়া তাবাসসুম, সমাজকর্ম বিভাগ।
কন্যাশিশু কোনো বোঝা নয়, অদম্য সম্পদ
যুগের পরিবর্তন ঘটলেও মানুষের চিন্তাধারায় এখনো প্রাচীন মানসিকতার ছাপ স্পষ্ট। সমাজের অনেক পরিবারে কন্যাসন্তানকে এখনো বোঝা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কন্যাশিশুর জন্মে যেখানে পরিবারের আনন্দ ম্লান হয়ে যায়, সেখানে পুত্রসন্তানের জন্মে আয়োজন করা হয় নানা আনন্দ উৎসবের। অনেক পরিবারে এখনো শুধু পুত্রসন্তান প্রত্যাশা করা হয়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। মূলত সামাজিক কুসংস্কার এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এ ধরনের বৈষম্যের জন্য দায়ী। অথচ কন্যাশিশুকে উপেক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা কখনোই সম্ভব নয়। গ্রামাঞ্চলে এখনো মেয়েদের পড়াশোনাকে শুধু টাকার অপচয় বলে মনে করা হয়। তাদের ধারণা, মেয়েরা স্বামীর বাড়ি চলে যাবে, তাই তাদের পড়াশোনার প্রয়োজন নেই, তাদের বিয়ে দিয়ে দিলেই যেন দায়িত্ব শেষ। অথচ কন্যাসন্তানের মধ্যে রয়েছে এক অদম্য শক্তি যা বদলে দিতে পারে গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রকে। এককথায় কন্যাশিশুরা হলো সমাজের আলোকবর্তিকা এবং সর্বোত্তম বিনিয়োগ। একটি গাছকে পানি দিলে যেমন ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে এবং ফলমূল দেয়, একজন কন্যাশিশুর মধ্যেও পড়াশোনার বিনিয়োগ করা হলে সে বড় হয়ে একজন সুশিক্ষিত মা হবে। একজন সুশিক্ষিত মা একজন ভালো সন্তানের জন্ম দেবে, যা আলোকিত করে তুলবে আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে। আজকের কন্যাশিশু আগামী দিনের মহীয়সী নারী এবং একজন সুশিক্ষিত মা। তাই কন্যাশিশুকে বোঝা না ভেবে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই তার সুপ্ত সম্ভাবনা বিকশিত হয়ে উঠবে সমাজ ও রাষ্ট্রের অদম্য শক্তিতে।
— উম্মে জোবায়দা, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ।
সুরক্ষিত শৈশব, বিকশিত কন্যাশিশু
একটি শিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে নিরাপদ শৈশবের মধ্য দিয়ে। কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, শিক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা একটি সুন্দর সমাজ গড়ার জন্য জরুরি। কিন্তু বাল্যবিবাহ, হয়রানি, পুষ্টির অভাব, শিক্ষায় বৈষম্য ও সামাজিক কুসংস্কার এখনো অনেক কন্যাশিশুর বেড়ে ওঠার পথে বাধা সৃষ্টি করে। তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা এবং স্বপ্ন পূরণের সুযোগ দেওয়া পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিক্ষা পেলে কন্যাশিশু নিজের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারে এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য পরিবারকে সচেতন হতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য দূর করতে মানুষের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন জরুরি। মনে রাখতে হবে, তার নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়, এটি তার অধিকার। সুরক্ষিত শৈশবই বিকশিত কন্যাশিশুর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রথম ধাপ।
— মাগফেরা আখতার, সমাজকর্ম বিভাগ।
শিকল ভাঙার গান: বাল্যবিয়েমুক্ত সমাজ গড়ার ডাক
আমাদের সমাজে বিদ্যমান বহু সমস্যার মধ্যে অন্যতম প্রধান সংকট হলো বাল্যবিবাহ। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৪৭ থেকে ৫১ শতাংশ মেয়েই বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে, যা দেশের জনগণ ও সামগ্রিক রাষ্ট্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই অন্ধকার দূর করতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আশার আলো দেখাচ্ছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম। গ্রামীণ পর্যায়ে তাদের গড়া কিশোর কিশোরী ক্লাব ও যুব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সাধারণ জনগণ দিন দিন সচেতন হয়ে উঠছে। বাল্যবিবাহ রোধে সামাজিক উদ্যোগের মূল ভিত্তি হলো পারিপার্শ্বিক মানুষকে জাগানো এবং নারী শিক্ষায় উৎসাহিত করা, যা নিয়মিত উঠান বৈঠক বা সচেতনতামূলক সেমিনারের মাধ্যমে করা সম্ভব। এ ছাড়া স্থানীয় মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, কাজী এবং ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের মতো সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এখানে প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারেন। আইন দিয়ে হয়তো সাজা নিশ্চিত করা যায়, কিন্তু সমাজ বদলাতে প্রয়োজন প্রতিটি ঘরে ঘরে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। সর্বস্তরের মানুষ সোচ্চার হলেই সুরক্ষিত হবে কন্যাশিশুদের ভবিষ্যৎ।
— নাসরিন আক্তার, সমাজকর্ম বিভাগ।
মেয়েদের শিক্ষা আছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা কতটুকু?
সমাজ আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষদের শিক্ষার পাশাপাশি নারীশিক্ষাও সমানভাবে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, নারীরা সব জায়গায় নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিলেও আজও নারীদের কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া হয় না। নারীদের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য সমাজে অটল রয়েছে। যেমন কোনো মেয়ে তার পছন্দমতো বিষয় নিয়ে পড়া কিংবা পছন্দমতো পেশা বেছে নেওয়া কিংবা জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়া, সবকিছুই তার পরিবারের সিদ্ধান্তে করতে হয়। শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তি, আত্মবিশ্বাস ও অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায়। শিক্ষিত মেয়েরাও যদি নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তাহলে সেই শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। মেয়েদের শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের আত্মনির্ভরশীল ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করে তোলাও শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য। মেয়েদের প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন শিক্ষার পাশাপাশি তারা নিজেদের জীবন সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবে।
— আফরিদা ইসলাম, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ।
আজকের মেয়ে, আগামী দিনের নেতৃত্ব
আজ যে মেয়ে স্বপ্ন দেখতে শেখে, আগামীকাল সেই মেয়েই স্বপ্নকে নেতৃত্বে রূপ দিতে পারে। একটি মেয়ের স্বপ্ন শুধু তার নিজের ভবিষ্যৎকেই আলোকিত করে না, সেই সঙ্গে এগিয়ে যায় একটি পরিবার, একটি সমাজ ও একটি দেশ। একটি মেয়ের নেতৃত্বের যাত্রা শুরু হয় শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে। শিক্ষার মাধ্যমে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, সমস্যার সমাধান করা এবং যুক্তিসহকারে নিজের মতামত প্রকাশ করার ক্ষমতা অর্জন করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত জ্ঞান, যোগাযোগের দক্ষতা, দলগত কাজ এবং সৃজনশীল চিন্তাভাবনা একজন তরুণীকে আরও যোগ্য করে তোলে। একটি মেয়ের স্বপ্ন পূরণে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের ইতিবাচক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, আগ্রহ ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেওয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে। মেয়েদের স্বপ্ন দেখার সুযোগ দেওয়া, তাদের সেই স্বপ্ন পূরণে উৎসাহিত করা এবং যোগ্যতা প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
— জুহা, সমাজকর্ম বিভাগ।