সমাবর্তন মানেই নতুন শুরু

সমাবর্তন আসলে কী এবং কেন?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে সমাবর্তন হলো একটি আনুষ্ঠানিক বিদায়বেলা এবং নতুন শুরুর স্বীকৃতি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পাঠ চুকিয়ে যখন একজন শিক্ষার্থী বৃহত্তর কর্মজীবনে প্রবেশ করতে যায় তখন তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এটি শুধু এক টুকরো কাগজ নেওয়ার অনুষ্ঠান নয়। এটি হলো একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম বড় অর্জনের স্বীকৃতি।
মা বাবার মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রম আর সন্তানের হাজারো নির্ঘুম রাতের ফসল এই ডিগ্রি। পরিবার, শিক্ষক আর বন্ধুদের সামনে নিজের সফলতার মুকুট পরার দিন এটি। একজন তরুণ যখন তার শিক্ষাজীবনের গণ্ডি পেরিয়ে পেশাগত জীবনের দরজায় দাঁড়ায় তখন এই অনুষ্ঠান তাকে আত্মবিশ্বাস জোগায়। বুঝিয়ে দেয় সে এখন নতুন পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত।
উদযাপনের রূপ ও রং
দিনটি শুরু হয় এক অন্যরকম উৎসবের আমেজ দিয়ে। পুরো ক্যাম্পাস সেজে ওঠে রঙিন সাজে। শিক্ষার্থীরা কালো গাউন আর টুপি পরে বন্ধুদের সঙ্গে মেতে ওঠে আড্ডায় আর ছবি তোলায়। সবার চোখেই থাকে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। এরপর শুরু হয় মূল আনুষ্ঠানিকতা। থাকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, চ্যান্সেলর বা রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি এবং অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য।
সবশেষে যখন ডিগ্রি হাতে আসে তখন সবাই মিলে একযোগে টুপি আকাশের দিকে ছুঁড়ে দেয়। এই টুপি ছোঁড়ার মুহূর্তটি যেন সব বাঁধন পেরিয়ে মুক্তির এক অদ্ভুত আনন্দ। ক্যাম্পাসের পরিচিত রাস্তা, প্রিয় ক্যানটিনের আড্ডা আর শিক্ষকদের বিদায় জানানোর এই মুহূর্তটি একই সঙ্গে আনন্দের এবং বেদনার।
কালো গাউন আর টুপির পেছনের ইতিহাস
সমাবর্তন বলতেই সবার আগে চোখের সামনে ভাসে কালো গাউন আর চারকোনা টুপির ছবি। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন এই অদ্ভুত পোশাকের শুরুটা কোথায়? এর ইতিহাস বেশ পুরোনো। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইউরোপের প্রথম দিকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এর প্রচলন শুরু হয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত গির্জার অধীনে ছিল এবং শিক্ষকরা ছিলেন ধর্মযাজক।
সেই সময়কার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনগুলোতে কোনো আধুনিক হিটারের ব্যবস্থা ছিল না। পাথরের তৈরি বড় বড় ভবনগুলোতে প্রচণ্ড ঠান্ডা থাকত। এই ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে তাই তারা লম্বা ও মোটা কাপড়ের গাউন পরতেন যাকে বলা হতো ‘কাপা ক্লউসা’। ধীরে ধীরে এটিই হয়ে ওঠে শিক্ষার প্রতীক।
আর সেই চারকোনা টুপি বা মর্টারবোর্ডের ডিজাইনটি এসেছে ১৫০০ শতকের দিকে। অনেকেই মনে করেন বই বা ইটের আকৃতি থেকে এর নকশা করা হয়েছে যা জ্ঞান এবং নির্মাণের প্রতীক। এটি একজন শিক্ষার্থীকে তার অর্জিত জ্ঞানের ভার মনে করিয়ে দেয়।
ট্যাসেল বা সুতোর গুচ্ছের অজানা অর্থ
টুপির একপাশে ঝুলে থাকা ট্যাসেল বা সুতোর গুচ্ছটিরও বিশেষ অর্থ আছে। সমাবর্তনের শুরুতে ডিগ্রি নেওয়ার আগে এটি টুপির ডান দিকে ঝুলিয়ে রাখা হয়। আর যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ডিগ্রি প্রদান করা হয় তখন তা ডান দিক থেকে বাম দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। ছোট্ট এই কাজটির অর্থ অনেক গভীর। এটি একজন মানুষের জীবনের একটি অধ্যায় শেষ করে নতুন অধ্যায়ে পদার্পণের প্রতীক।
সমাবর্তন শুধু নির্দিষ্ট কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে আটকে থাকে না। এটি সার্বজনীন একটি আবেগ। এটি এমন এক দিন যেদিন মা বাবার চোখের জল আর সন্তানের হাসিমুখ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
ডিএ/