সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

পুজোয় একা নয়, সঙ্গী চাই!

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

উৎসব মানেই আনন্দ, আড্ডা আর প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো। কিন্তু এই ‘প্রিয় মানুষ’ বলতে যে সব সময় প্রেমিক বা প্রেমিকাকেই বোঝাতে হবে, এমন নয়। কেউ পরিবারের সঙ্গে উৎসব কাটান, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ আবার একাই বেরিয়ে পড়েন শহর দেখতে। তবু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে উৎসবের ছবি যেন অনেকটাই হয়ে উঠেছে ‘কাপল ফ্রেন্ডলি’। দুজনের ছবি, হাত ধরে ঘোরার মুহূর্ত, একই পোশাকে ছবি কিংবা রেস্তোরাঁয় পাশাপাশি বসে থাকা। এসব দেখতে দেখতে একা থাকা মানুষটির মনে কখনো কখনো তৈরি হতে পারে অদ্ভুত এক শূন্যতা।

সেখান থেকেই জন্ম নিচ্ছে সম্পর্কের এক নতুন ধারণা। দীর্ঘদিনের প্রেম নয়, বিয়ের পরিকল্পনাও নয়। শুধু উৎসবের কয়েক দিন একসঙ্গে ঘোরা, আড্ডা দেওয়া, ছবি তোলা কিংবা মানুষের সামনে ‘একসঙ্গে’ থাকা। অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের জন্য সঙ্গী।

ভারতে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এমন প্রবণতার খবর সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ উৎসবের সময় ঘোরাঘুরির জন্য সাময়িক সঙ্গী খুঁজছেন। আবার কেউ অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সঙ্গ দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। বিষয়টি শুনতে অস্বাভাবিক লাগলেও বিশ্বের কিছু দেশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সঙ্গী ভাড়া নেওয়ার ধারণা আগে থেকেই রয়েছে।

জাপানে এমন পরিষেবার অস্তিত্ব বেশ পুরোনো। সেখানে কেউ কফি খাওয়া, কেনাকাটা, শহর ঘোরা কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের একজন সঙ্গী নিতে পারেন। কারও প্রয়োজন শুধু গল্প করার মানুষ, কারও প্রয়োজন সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে পাশে থাকার একজন ব্যক্তি। পরিষেবার ধরন অনুযায়ী পারিশ্রমিকও নির্ধারিত হয়। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাপানে বন্ধুত্বের ধরনের সঙ্গের জন্য ঘণ্টায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা থেকে খরচ হতে পারে। প্রেমিক বা প্রেমিকার ভূমিকায় সঙ্গ চাইলে সেই খরচ ঘণ্টায় প্রায় চার হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এই ধরনের পেশাদার সঙ্গী পরিষেবার উদ্দেশ্য মূলত সামাজিক সঙ্গ দেওয়া। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারও সঙ্গে থাকা, কথা বলা, ঘুরতে যাওয়া বা কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা। এর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি যুক্ত নয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি ভাবলে অবশ্য ছবিটা কিছুটা আলাদা। এখানে প্রেম বা সম্পর্ক এখনো অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত বিষয়। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সামাজিক পরিবেশের নানা প্রত্যাশা তরুণ-তরুণীদের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ঈদ, পূজা, পহেলা বৈশাখ কিংবা কোনো বড় উৎসব এলে ‘কার সঙ্গে যাচ্ছ’, ‘এত সাজগোজ কেন’, ‘তোমার সঙ্গে কে ছিল’ ধরনের প্রশ্নও অনেকের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই চাপকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে। আগে হয়তো বন্ধুর ঈদের দিন ঘোরাঘুরির ছবি দেখতেন কয়েকজন পরিচিত মানুষ। এখন একই সময়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা টিকটকে অসংখ্য মানুষের সাজগোজ, ঘোরাঘুরি, রেস্তোরাঁয় খাওয়া এবং যুগল মুহূর্ত চোখের সামনে আসে। ফলে নিজের জীবনকে অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাও বাড়তে পারে।

এখানে ‘একা থাকা’ আর ‘একাকিত্ব’কে এক করে দেখলে ভুল হবে। একজন মানুষ একা থেকেও আনন্দে থাকতে পারেন। আবার অনেক মানুষের ভিড়ের মধ্যেও কেউ ভীষণ একাকী বোধ করতে পারেন। উৎসবের সময় এই পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয়। কারণ উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি, কার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করছি এবং আমাদের জীবনে বিশেষ মানুষটি কে।

এই জায়গাতেই সাময়িক সঙ্গীর ধারণা আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। কেউ হয়তো সত্যিই প্রেমের সম্পর্কে যেতে চান না, কিন্তু উৎসবের দিনগুলো একা কাটাতেও চান না। কেউ হয়তো নতুন শহরে থাকেন, পরিবার দূরে। কারও বন্ধুরা ব্যস্ত, কারও সম্পর্ক ভেঙে গেছে। আবার কেউ হয়তো শুধুই নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে চান। তাদের কাছে কয়েক ঘণ্টার একজন সঙ্গী হয়তো নিছক সামাজিক প্রয়োজন মেটানোর একটি উপায়।

ডেটিং অ্যাপের জনপ্রিয়তাও এই পরিবর্তিত সামাজিক বাস্তবতার একটি ইঙ্গিত দেয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ২০২৪ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা যায়, কলকাতার ৪৩ শতাংশ তরুণ-তরুণী মনে করেন, উৎসবের সময় নতুন সঙ্গীকে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ তুলনামূলক কম থাকে। একই সমীক্ষায় কলকাতার প্রতি তিনজন সিঙ্গেলের একজন জানিয়েছেন, উৎসবের সময় মনের মানুষ খুঁজতে তারা ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করেছেন।

বাংলাদেশেও তরুণদের সম্পর্কের ধরন, পরিচয়ের মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগের ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। তবে তাই বলে বিদেশি কোনো প্রবণতা সরাসরি বাংলাদেশে জনপ্রিয় হয়ে যাচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণ নেই। বরং বিষয়টি আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন রাখে: উৎসবের আনন্দে আমরা কি সত্যিই একজন সঙ্গী চাই, নাকি অন্যদের দেখে একা থাকার অস্বস্তি থেকে মুক্তি চাই?

আরেকটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখা দরকার, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত হওয়া বা অর্থের বিনিময়ে কারও সঙ্গে দেখা করার ক্ষেত্রে ঝুঁকি থাকতে পারে। ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি, ঠিকানা, অর্থনৈতিক লেনদেন কিংবা সরাসরি সাক্ষাতের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। বিশেষ করে ‘ভাড়া করা সঙ্গী’ ধরনের অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় প্রতারণা বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

উৎসবের সৌন্দর্য শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের প্রদর্শনে নয়, আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে। ঈদের সকালে পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়া, পূজার মণ্ডপে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, বৈশাখে রিকশায় শহর দেখা কিংবা ছুটির দিনে একা কোনো ক্যাফেতে বসে বই পড়া, সবই হতে পারে উৎসব উদযাপনের নিজস্ব ধরন।

কয়েক ঘণ্টার জন্য একজন সঙ্গী পাওয়া হয়তো একাকিত্বের মুহূর্তটিকে সহজ করতে পারে। কিন্তু মানুষের সত্যিকারের প্রয়োজন শুধু পাশে একজন মানুষ থাকা নয়, বরং এমন একজনকে পাওয়া যার সঙ্গে নিজের আনন্দ, অস্বস্তি, গল্প কিংবা নীরবতাটুকুও ভাগ করে নেওয়া যায়। তাই উৎসবের দিনে অন্যের ছবির সঙ্গে নিজের জীবন মেলানোর চেয়ে নিজের আনন্দের সংজ্ঞাটা নিজেই ঠিক করা হয়তো বেশি জরুরি। শেষ পর্যন্ত উৎসব তো সবার জন্য, শুধু যুগলদের জন্য নয়।