শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

সুযোগ ও সমতা: পদে পদে কতটা বৈষম্যের শিকার নারী?

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

নারী অধিকার ও সমান সুযোগের সংগ্রাম দীর্ঘদিনের হলেও বৈষম্য আজও প্রকট। শিক্ষাঙ্গন থেকে কর্মক্ষেত্র—সব জায়গায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও পদে পদে তাঁদের লড়তে হচ্ছে অদৃশ্য বাধার সঙ্গে। ‘একই যোগ্যতা, একই সুযোগ’—এই নীতিটি কি আমাদের সমাজে বাস্তবে কাজ করছে? সমতা ও অধিকারের এই রূঢ় বাস্তবতা নিয়ে নিজেদের ভাবনা তুলে ধরেছেন সরকারি তিতুমীর কলেজের ইংরেজি বিভাগের কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী। তাদের ভাবনাগুলো গ্রন্থনা করেছেন একই বিভাগের শিক্ষার্থী আফরিনা আক্তার।

কর্মক্ষেত্রে সমতার চ্যালেঞ্জ

যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কর্মক্ষেত্রে নারীদের বেতনবৈষম্য, পদোন্নতিতে বাধা, পুরুষ সহকর্মীদের অসহযোগিতা কিংবা হেনস্তা এবং নেতৃত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। শিক্ষাজীবনে ভালো ফলাফল করেও গৃহস্থালি ও সন্তান পালনের একচেটিয়া দায়িত্বের কারণে অনেক নারী পেশা নির্বাচনে দ্বিধায় পড়েন। পরিবারের চাপে বা ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেকেই মাঝপথে কর্মজীবন থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। কর্মক্ষেত্রে প্রকৃত সমতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন একজন নারীর মূল্যায়ন কেবল তাঁর নারী পরিচয়ে না হয়ে, মানুষ হিসেবে তাঁর যোগ্যতা, দক্ষতা ও অবদানের ভিত্তিতে হবে।

— মায়েদা ইসলাম মুন

​যাত্রাপথে দৈনন্দিন নীরব যুদ্ধ

একই দায়িত্ব, একই গন্তব্য, একই সময়; তবুও কর্মস্থলে যাওয়ার পথে নারীদের লড়তে হয় হাজারো নীরব বাধার সঙ্গে। সকাল ৮টা বাজলেই বাসের হেলপারের মুখে শোনা যায়—‘মহিলা উঠবেন না’। বাসে দাঁড়ানোর জায়গা থাকলেও অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানি এড়ানোর খোঁড়া যুক্তি দিয়ে নারীদের বাসে উঠতে দেওয়া হয় না। অনেক চালককে বলতে শোনা যায়, ‘এক বেডির জায়গায় তিনডা ব্যাডা যাত্রী নিতাম পারুম, বেডি উঠাইস না।’ অথচ তাঁরা জানেন না, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ওই নারী হয়তো তাঁর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সময়মতো অফিসে না পৌঁছালে পুরুষের মতো নারীরও বেতন কাটা যায়, কৈফিয়ত দিতে হয়। নারীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ‘পিংক বাস’ চালু হলেও তা যেন নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। এখন সাধারণ বাসে উঠতে গেলেই শুনতে হয়, ‘আপনাদের পিংক বাসে যান, আমাদের বাসে কেন?’ প্রশ্ন জাগে, ঠিক কেমন সমাজ হলে নারীদের প্রতিদিন রাস্তায় এই নীরব যুদ্ধে নামতে হতো না?

— জুবাইদা গুলশান আরা ক্যামেলিয়া

​স্বপ্ন পূরণে পরিবারের ভূমিকা

জীবনের প্রতিটি ধাপে নারীর নতুন পরিচয় ও দায়িত্ব যুক্ত হয়। এর আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় তার নিজস্ব কিছু স্বপ্ন ও ইচ্ছা। এই স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পরিবারের সমর্থন নারীর এগিয়ে চলার পথকে সহজ করে। কিন্তু সব সময় কি পরিবার সে পথ মসৃণ করে? নতুন কিছু করতে গেলেই ‘মানুষ কী বলবে’—এই অজুহাতে নারীকে নিরুৎসাহিত করা হয়; নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগটুকুও দেওয়া হয় না। অথচ নারীর জীবনে পরিবারের মানসিক সমর্থন অনেক বড় একটি শক্তি। পরিবার শুধু একটু ভরসা জোগালেই নারী অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। বাস্তবে অনেক পরিবার এই ন্যূনতম সমর্থনটুকুও দেয় না, এমনকি পারিবারিক সিদ্ধান্তে নারীর মতামতও গ্রাহ্য করা হয় না। ঘরের মানুষ একজন নারীকে যেভাবে মূল্যায়ন করে, বাইরের সমাজও তাকে সেভাবেই দেখতে শেখে। তাই সমতার শুরুটা হোক পরিবার থেকেই; নারীর স্বপ্ন, মতামত ও সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে।

— সাদিয়া আফরীন সুমা

​অগ্রযাত্রায় সমতার বাধা

বর্তমান বিশ্বের নারীরা কেবল ঘরে নয়; শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে নিজেদের যোগ্যতা, পরিশ্রম ও দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছেন। কিন্তু সেই অনুপাতে তাঁরা কি উপযুক্ত সুযোগ পাচ্ছেন? ‘একই যোগ্যতা, একই সুযোগ’—নীতিটি আজও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। একই প্রতিষ্ঠান থেকে সমমানের ডিগ্রি নেওয়ার পরও নারীরা তাঁদের প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। অনেক কর্মক্ষেত্রে নারীকে শুধুই ‘প্রেজেন্টেশন’ বা প্রদর্শনের বস্তু হিসেবে দেখা হয়। পুরুষের সমান পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত পদে পৌঁছাতে নারীদের পদে পদে বাধার মুখে পড়তে হয়, কখনো কখনো হতে হয় দুর্নামের শিকার। নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব তো রয়েছেই, আবার কর্মী ছাঁটাইয়ের সময়ও সবার আগে নারীর ওপরই খড়্গ নেমে আসে। নারী ও পুরুষের শারীরিক গঠন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একজন নারী যখন ঘর ও পরিবারের দায়িত্ব সামলে কর্মক্ষেত্রেও পুরুষের সমান কাজ করেন, তখন তাঁর এই দ্বিগুণ সংগ্রাম ও ত্যাগকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ এবং কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

— জান্নাতুল বুশরা

শুভ্র/