সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ
Network News BD
QR Code
নিউজ লিঙ্ক স্ক্যান করুন

পথহারা সন্ধ্যার দিকচিহ্ন: আমার প্রিয় শিক্ষক আজমীরা খানম

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক

সাবিকুন নাহার অহনা:

​কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা ঠিক প্রয়োজনের সময় আমাদের সামনে আলো হয়ে দাঁড়ান। জীবনের পাঠ্যবই যখন দুর্বোধ্য লাগে, তখন যাঁরা শব্দের বাইরেও অর্থ খুঁজে দেন। আমার জীবনে তেমনই এক আলোকবর্তিকা আজমীরা খানম। তিনি শুধু আমার প্রিয় শিক্ষিকা নন, জীবনের অন্যতম প্রিয় মানুষও; যাঁর হাত ধরে আমি কেবল পাঠ্যবই পড়তে নয়, মানুষ হয়ে উঠতে শিখেছি।

​২০০৬ সাল থেকে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে তিনি যে সৃজনশীল ধারায় পাঠদান করে আসছেন, তা কেবল তাঁর পেশাগত উৎকর্ষ নয়, একজন আদর্শ মানুষের পরিচয়ও বহন করে। আমি সৌভাগ্যবান, কারণ মাধ্যমিকের পাঁচ বছর তাঁর সরাসরি সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়েছি। সেখানে বইয়ের পৃষ্ঠা ছাড়াও শিখেছি সহানুভূতি, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তির পাঠ। আজমীরা ম্যামের শ্রেণিকক্ষ ছিল যেন এক উষ্ণ আশ্রয়। ছোট ছোট গল্প আর বাস্তব অভিজ্ঞতায় তিনি বিষয়বস্তুকে এমনভাবে তুলে ধরতেন, যেন প্রতিটি পাঠ হয়ে ওঠে জীবনের আয়না। তিনি চাইতেন, আমরা ভালো শিক্ষার্থী হওয়ার পাশাপাশি ভালো মানুষ হয়ে উঠি। প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদানের পাশাপাশি তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও দক্ষতা উন্নয়নে অংশ নিতেও দারুণ উৎসাহ দিতেন।

​সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমি ছিলাম খুব চুপচাপ আর ভীতু প্রকৃতির। তাঁর মৃদু ডাক, প্রশংসার দৃষ্টি কিংবা একান্তে সাহস জোগানোর কৌশলে আমি ধীরে ধীরে ভেতর থেকে বিকশিত হতে শুরু করি। আজ যেটুকু আত্মবিশ্বাস নিয়ে পথ চলতে শিখেছি, তার পেছনে আজমীরা ম্যামের অবদান অসীম। তাঁর মানবিকতা আমার চোখে সবচেয়ে বড় অর্জন। নিজে হাজার সমস্যায় থাকলেও কখনো তা আমাদের বুঝতে দেননি। উল্টো আমাদের দুঃসময়কে নিজের মতো করে অনুভব করেছেন।

​এখনো মনে পড়ে আমার এক কঠিন সময়ে তাঁর বলা কথাগুলো: “শিখছো কোথা? ঠেকছি যেথা। শিখছো কোথা? ঠকেছি যেথা।” এই বাক্যগুলো কোনো দৃশ্যমান ওষুধ ছিল না, তবু সেই মুহূর্তে আমার মনোবলে অদ্ভুত এক শক্তি জুগিয়েছিল। আমি বুঝেছিলাম, ব্যর্থতা থেকেই শিখতে হয়; ছোট ছোট দুঃখের বুকেই লুকিয়ে থাকে বর্ণিল বিজয়ের বীজ। তাঁর এই মানবিকতার পরিসর শুধু আমার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না। যে শিক্ষার্থীই সমস্যায় পড়েছে, তিনি পরম মমতায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এত ভালোবাসা ও সম্মান পাওয়া সত্ত্বেও তাঁর মনে কখনো অহংকারের ছায়া পড়েনি, বরং সবার অনুভূতির প্রতি তিনি সমান শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন।

​আজ সবচেয়ে বেশি মিস করি তাঁর ক্লাসের সেই চেনা ঘ্রাণ, বোর্ডে চক ঘষার শব্দ কিংবা তাঁর গলার স্বর, যা খুব ভোরে নতুন দিনের মতো শোনাত। মাঝে মাঝে ভাবি, আরেকটা সকাল যদি পেতাম, আরেকবার যদি সেই শ্রেণিকক্ষে ফিরে যেতে পারতাম! স্কুলজীবন পেরিয়ে আজ বহু বছর হয়ে গেছে। তবুও আজও দ্বিধা, দুশ্চিন্তা বা অভিমান যখনই জীবনের দরজায় কড়া নাড়ে, আমি সেই পরিচিত নম্বরে ফোন করি। ওপাশ থেকে ভেসে আসে সেই নির্ভরতার স্বর। আজও তিনি আগের মতোই মনোযোগ দিয়ে শোনেন, পরামর্শ দেন এবং ভরসা জোগান।

​আজমীরা ম্যাম কেবল পেশাগত দক্ষতার কারণে আমার প্রিয় শিক্ষক নন। তিনি প্রিয়, কারণ তিনি জ্ঞানকে ভালোবাসায় আর দায়িত্বকে স্নেহে পরিণত করেন। নিজের আলোয় আমাদের অন্তরে জাগিয়ে তোলেন মহত্ত্বের বোধ। তিনি আমার ভাঙাগড়ার সাক্ষী, পথহারা সন্ধ্যার ধ্রুবতারা। আমি জানি, তাঁর স্নেহের ঋণ কখনো শোধ হওয়ার নয়। কিছু শিক্ষক মনে থাকেন, আর কিছু শিক্ষক রয়ে যান মনের একদম গভীরে। আজমীরা ম্যাম তেমনই একজন। তাঁর মতো একজন মানুষ পাওয়া কেবল শিক্ষাজীবনের সৌভাগ্য নয়, পুরো জীবনের অমূল্য সম্পদ।

লেখক: শিক্ষার্থী (গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ), বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)

শুভ্র/