তরুণদের ঘুমহীনতা: কারণ প্রভাব ও উত্তরণের উপায়

ঘুম আমাদের শরীরকে কর্মক্ষম করে এবং মস্তিষ্ককে করে পুনরুজ্জীবিত। মনের স্বাভাবিক বিশ্রাম ও জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ঘুম যা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ এবং সুন্দর জীবনযাপনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মানুষকে শারীরিকভাবে সুস্থ রাখতে এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে কর্মক্ষম করে তুলতে পরিমিত ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য যেমন পুষ্টিকর খাদ্যের প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুমের। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী ও ঘুম গবেষক অধ্যাপক ম্যাথিউ ওয়াকার বলেন প্রতিদিন আমাদের মস্তিষ্ক ও শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ঘুম। একই সুরে ইংল্যান্ডের নাট্যকার ও কবি থমাস ডেকার বলেছিলেন ঘুম হলো সেই সোনার শৃঙ্খল যা আমাদের স্বাস্থ্য ও শরীরকে একসূত্রে বেঁধে রাখে।
কিন্তু বর্তমানে কিশোর কিশোরী ও তরুণ তরুণীদের মধ্যে পর্যাপ্ত ঘুমের বড্ড অভাব দেখা যাচ্ছে। ধূমপান মাদকাসক্তি অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং অনিয়মিত জীবনযাপন ঘুমের অভাবের অন্যতম প্রধান কারণ। ঘুমের নির্দিষ্ট সময়ে না ঘুমিয়ে অনেকেই মোবাইল ফোনে গেম খেলা ফেসবুক টিকটক ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার কিংবা সিনেমা দেখায় ব্যস্ত থাকেন। এছাড়া রাত জেগে অনলাইন ক্লাস মিটিং বা অন্যান্য কর্মব্যস্ততাও তাঁদের নিয়মিত ঘুম থেকে বঞ্চিত করছে। এমনকি বিভিন্ন ট্রেনিং বা ক্যাম্পিংয়েও দেখা যায় অনেক রাত পর্যন্ত জাগিয়ে রেখে ভোরে উঠতে বাধ্য করা হয় যা পর্যাপ্ত ঘুমের মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়।
অনিয়মিত ঘুম বা ঘুম কম হওয়ার কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নানা নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। অল্পতেই রাগ বা বিরক্তি প্রকাশ করা ছোটখাটো বিষয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়া কিংবা সারাদিন ঘুম ঘুম ভাব থাকা এখন নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। খিটখিটে মেজাজের কারণে অনেক সময় ইতিবাচক কথাবার্তাও তাঁদের কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব থাকলে একঘেয়েমি ও খামখেয়ালি মনোভাব বাড়ে এবং কিছু মানুষের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের প্রবণতা দেখা দেয়।
পাশাপাশি আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা হুটহাট আত্মঘাতী বা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং পরক্ষণেই আবার তা পরিবর্তন করার মতো মানসিক অস্থিরতাও তৈরি হয়। ঘুমের অভাবে সহমর্মিতা ও মানবীয় আচরণেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাঁরা ভালো মন্দ বুঝতে ও বিচার বিশ্লেষণ করতে ব্যর্থ হন এবং পারিবারিক বা সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ কমিয়ে দিয়ে ধীরে ধীরে একাকী হয়ে পড়েন।
আমরা প্রায় সময়ই পরিচিতদের খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানতে পারি তাঁদের ঠিকমতো ঘুম হয় না। অনেকেই ঘুমের ওষুধ খেয়েও ঘুমহীনতায় ভুগছেন। এর পেছনে রাত জেগে অনলাইনে পড়ে থাকা এবং ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি আসক্তিই বেশি দায়ী। এই তরুণ প্রজন্মকে সুস্থ মস্তিষ্কে ফিরিয়ে আনতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সচেতনতা। প্রয়োজন ছাড়া রাতের অনলাইন কার্যক্রম সীমিত করে স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সম্ভব হলে অধিকাংশ কাজ অফলাইনে করার ব্যবস্থা করতে হবে। বাবা মায়ের উচিত সন্তানদের নিয়ে মাঝে মধ্যে বাসায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা। পাশাপাশি পরিবার থেকেই নির্দিষ্ট ঘুমের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া এবং মোবাইল ব্যবহারের একটি নিয়ম তৈরি করে দেওয়া জরুরি। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোও একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা উচিত যাতে কারও ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে।
সুস্থ দেহ সুন্দর মন এবং নৈতিক ও মানবিক চরিত্রের সমাজ গড়তে হলে তরুণদের মধ্যে পর্যাপ্ত ঘুমের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। কেননা সময়মতো রাতের পর্যাপ্ত ঘুমই আমাদের একটি সুন্দর ও কর্মক্ষম দিন উপহার দিতে পারে।
লেখক পরিচিতি: মো. মিজানুর রহমান, শিক্ষার্থী (সমাজকর্ম বিভাগ), সরকারি তোলারাম কলেজ নারায়ণগঞ্জ