ডিজিটাল ব্যাংকিং নিরাপদ রাখতে সচেতন হোন

মোবাইলে হঠাৎ একটি বার্তা এল, ‘আপনার অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন হয়েছে।’ সঙ্গে একটি লিংক। স্বাভাবিকভাবেই বুকটা ধক করে উঠতে পারে। বার্তাটি সত্যি কি না যাচাই করার আগেই যদি লিংকে ক্লিক করা হয়, কয়েক সেকেন্ডেই বিপদ নেমে আসতে পারে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা যেমন হাতের মুঠোয় টাকা ও হিসাবের নিয়ন্ত্রণ এনে দিয়েছে, তেমনি অসতর্কতার সুযোগও তৈরি করেছে।
বাংলাদেশে ব্যাংকিং সেবা দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন পেমেন্ট ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। তবে এই সুবিধার সঙ্গে বাড়ছে নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জও। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এমএফএস সেবাদাতাদের সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে ১৭ দফা নির্দেশনা দেয়। অর্থাৎ ঝুঁকিটি কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ের নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতারণার ধরনও বদলাচ্ছে। একসময় অপরিচিত ফোন করে ‘ওটিপি’ বা পিন জানতে চাওয়াই ছিল বহুল পরিচিত কৌশল। এখন ভুয়া ওয়েবসাইট, নকল বার্তা, সন্দেহজনক লিংক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুয়া অ্যাকাউন্ট কিংবা পরিচিত প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতারক সরাসরি পাসওয়ার্ড না চেয়েও এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যাতে ব্যবহারকারী নিজেই সংবেদনশীল তথ্য দিয়ে ফেলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন নির্দেশনাতেও ফিশিং, সামাজিক প্রকৌশলভিত্তিক প্রতারণা এবং নিরাপদ পাসওয়ার্ড ব্যবহারে গ্রাহক সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা জরুরি। কার্ডের নম্বর, মেয়াদ, সিভিভি, পিন বা ওটিপি অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা উচিত নয়। ব্যাংকের পরিচয়ে ফোন এলেও আগে নিশ্চিত হওয়া দরকার, সত্যিই সেটি ব্যাংক থেকে এসেছে কি না। বিশেষ করে ফোন, ই-মেইল বা এসএমএসে পাওয়া কোনো লিংকে ঢুকে লগইন তথ্য দেওয়ার আগে থামা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডসংক্রান্ত নির্দেশনায়ও ২-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, এসএমএস বা ই-মেইল অ্যালার্ট এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও দেখাচ্ছে, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি গ্রাহকের সতর্কতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের এক ঘটনায় বেশ কয়েকজন কার্ডধারীর অননুমোদিত লেনদেনের অভিযোগ সামনে আসে। এসব ঘটনার পর ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য, ওটিপি, কার্ডের নিরাপত্তা এবং অচেনা সফটওয়্যার বা ম্যালওয়্যার থেকে ডিভাইস সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে সতর্ক করে।
তবে প্রতারণার শিকার হলে আতঙ্কিত হয়ে বসে থাকারও সুযোগ নেই। দ্রুত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অফিসিয়াল হটলাইন বা শাখায় যোগাযোগ করে কার্ড বা সংশ্লিষ্ট সেবা বন্ধের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজন হলে ব্যাংকের অভিযোগ ব্যবস্থায় বিষয়টি জানাতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও গ্রাহকদের প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা সেবাদাতার কাছে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দেয়; সমাধান না হলে নির্ধারিত অভিযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিষয়টি উত্থাপন করা যায়।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের নিরাপত্তা শুধু ব্যাংকের প্রযুক্তিগত দেয়াল দিয়ে নিশ্চিত হয় না। সেই দেয়ালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গ্রাহক নিজেই। তাই অচেনা বার্তায় তাড়াহুড়া নয়, অস্বাভাবিক ফোনে বিশ্বাস নয়, আর কোনো লেনদেনের আগে একবার যাচাই। ডিজিটাল জীবনে নিরাপত্তার সবচেয়ে কার্যকর পাসওয়ার্ড কখনো কখনো একটি ছোট অভ্যাস: ক্লিক করার আগে একটু থামুন।
শুভ্র/