মলাটের ঘ্রাণ আর শব্দের টানে

প্রযুক্তির এই যুগেও মুদ্রিত বইয়ের আবেদন ফুরায়নি। বরং বইপ্রেমীদের কাছে প্রতিটি পাতা উল্টানোর শব্দ আজও এক জাদুকরী সিম্ফনি।
বৃষ্টিভেজা এক অলস বিকেল। জানালার পাশে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা আর কোলের ওপর খুলে রাখা প্রিয় কোনো উপন্যাসের পাতা। কিংবা নীলক্ষেতের পুরনো বইয়ের স্তূপ থেকে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া কাঙ্ক্ষিত কোনো বইয়ের সোঁদা গন্ধ। এই ছোট ছোট দৃশ্যগুলোই একজন বইপ্রেমীর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতির সমার্থক। প্রতিদিনের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে এক মলাট থেকে আরেক মলাটের ভেতর ডুব দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আজ ৯ আগস্ট, বিশ্ব বইপ্রেমী দিবস। যারা বইয়ের পাতায় নিজেদের হারিয়ে ফেলতে ভালোবাসেন, দিনটি মূলত তাদেরই উদ্যাপনের। কেন একটি সাধারণ কাগজের স্তূপ মানুষের মনে এত গভীর রেখাপাত করতে পারে, এই দিনে সেই চিরায়ত রহস্যেরই যেন উত্তর খোঁজা হয়।
মানুষ কেন বই পড়ে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে পাওয়া যায় হাজারো যুক্তি। তবে সবচেয়ে বড় সত্য হলো, বই মানুষকে এক জীবনে অসংখ্য জীবন যাপনের সুযোগ করে দেয়। মার্কিন লেখক জর্জ আর. আর. মার্টিন বলেছিলেন, “যে বই পড়ে, সে মৃত্যুর আগে হাজারটা জীবন বাঁচে। আর যে পড়ে না, সে বাঁচে মাত্র একবার।” আবার বিখ্যাত সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেস বিশ্বাস করতেন, “স্বর্গ নিশ্চয়ই এক বিশাল লাইব্রেরির মতো।” পারস্যের অমর কবি ওমর খৈয়াম তাঁর রুবাঈয়াতে বইকে শ্রেষ্ঠ সঙ্গী হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, পার্থিব অনেক আনন্দ একসময় ফুরিয়ে যায়, কিন্তু একটি ভালো বই অনন্তযৌবনা। বই কেবল কিছু কালির আঁচড় নয়, এটি এমন এক জাদুকরী বাহন, যা পাঠককে মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে দিতে পারে হাজার বছর আগের কোনো প্রাচীন সভ্যতায় কিংবা দূর ভবিষ্যতের কোনো কল্পিত গ্রহে।
বর্তমান সময়টা চরম মাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ আর ই-বুকের ভিড়ে মুদ্রিত বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই একসময় শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্ডল বা পিডিএফ পড়ার সুবিধা হয়তো বেড়েছে, সহজলভ্য হয়েছে দেশ-বিদেশের দুর্লভ সব সাহিত্য। কিন্তু নতুন বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দ আর কাগজের ঘ্রাণের যে নিজস্ব মাদকতা রয়েছে, তা কোনো ডিজিটাল স্ক্রিন দিতে পারে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অমর একুশে বইমেলার জনসমুদ্র কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ঢাকার বাতিঘর, কাঁটাবন বা নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানগুলোতে সব বয়সী মানুষের ভিড় প্রমাণ করে, মুদ্রিত বইয়ের আবেদন এখনো অমলিন। শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য শহরেও গড়ে উঠছে নান্দনিক সব বইয়ের দোকান। পাড়ায় পাড়ায় গড়ে ওঠা পাঠাগার ও পাঠচক্রগুলো বইপড়ার এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে চমৎকারভাবে তুলে ধরছে।

বই পড়া কেবল মানসিক প্রশান্তিই দেয় না, এর রয়েছে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত স্বাস্থ্যগত সুবিধাও। যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ছয় মিনিট মনোযোগ দিয়ে বই পড়লে মানসিক চাপ প্রায় ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। গবেষকদের মতে, এটি গান শোনা বা এক কাপ চা পানের চেয়েও বেশি কার্যকর। নিয়মিত বই পড়লে মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগগুলো সক্রিয় থাকে, যা বার্ধক্যে স্মৃতিভ্রম বা অ্যালজেইমার্সের মতো রোগের ঝুঁকি কমায়। এর পাশাপাশি, অন্যের লেখা গল্প বা আত্মজীবনী পড়ার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সহানুভূতি ও মানবিকতাবোধ জাগ্রত হয়। বিশ্বখ্যাত রুশ সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কি যেমনটি বলেছিলেন, “আমার মধ্যে উত্তম বলে যদি কিছু থাকে, তার জন্য আমি বইয়ের কাছে ঋণী।”
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও বইপড়ুয়াদের অভ্যাসে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ‘বুক রিভিউ’ বা বই আলোচনার গ্রুপ তৈরি হয়েছে। তরুণ পাঠকরা তাদের পড়া বইয়ের অনুভূতি সেখানে ভাগ করে নিচ্ছেন। এতে করে পাঠক আর নিজের ঘরের কোণে একা থাকছেন না, বরং যুক্ত হচ্ছেন এক বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে। ভার্চুয়াল জগতের এই ইতিবাচক দিকটি অনেককেই নতুন করে বইমুখী করছে, যা আমাদের সমাজের জন্য একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন।
জীবন একটি চলমান সংগ্রাম, আর এই দীর্ঘ পথে বই হতে পারে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। বিশ্ব বইপ্রেমী দিবসে আমাদের নতুন করে উপলব্ধি করার সময় এসেছে যে, একটি ভালো বই কেবল সময় কাটানোর মাধ্যম নয়; এটি মনন গঠনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। আজ দিনের শেষে যখন ঘরে ফিরবেন, তখন স্মার্টফোনের নীল আলো থেকে চোখ সরিয়ে শেলফ থেকে নামিয়ে নিতে পারেন পুরনো কোনো প্রিয় বই। ধুলোমাখা পাতাগুলো হয়তো আপনাকে মনে করিয়ে দেবে, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো এখনো মলাটের ভেতরেই আপনার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
শুভ্র/