রক্তের বাঁধন ছাড়িয়ে এক চিরন্তন বন্ধুত্বের নাম ‘বোন’

মা-বাবার বকুনির হাত থেকে বাঁচানো কিংবা নিজেদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মিষ্টি সম্পর্কের নাম বোন। এক ছাদের নিচে বড় হতে হতে কখন যে সে জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে ওঠে, তা হয়তো আমরা টেরই পাই না। জীবনের আনন্দ, বেদনা, না-বলা কথা কিংবা ছোট ছোট গোপন রহস্যগুলো সবার আগে যার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়, সে হলো বোন। শুধু একই পরিবারের হতে হবে এমন কোনো কথা নেই; কখনো কোনো কাজিন, আবার কখনো বা খুব কাছের কোনো বান্ধবীও হয়ে উঠতে পারে আত্মার বোন। এই অমূল্য ও চিরন্তন সম্পর্কটিকে উদ্যাপন করতেই বিশ্বজুড়ে পালন করা হয় ‘সিস্টার্স ডে’ বা বোন দিবস।
প্রতি বছর আগস্ট মাসের প্রথম রবিবার এই বিশেষ দিনটি পালিত হয়। দিনটির পেছনে খুব প্রাচীন কোনো প্রথা না থাকলেও এর ইতিহাস বেশ চমৎকার। ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির মেমফিস শহরের বাসিন্দা ট্রিসিয়া এলিওগ্রাম এবং তাঁর বোন মিলে সর্বপ্রথম এই দিনটি পালনের ধারণা নিয়ে আসেন। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বোনদের মধ্যকার এই অসাধারণ ভালোবাসা ও মমতার সম্পর্কটিকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা। মজার ব্যাপার হলো, ইংরেজিতে ব্যবহৃত ‘সিস্টার’ শব্দটি এসেছে পুরোনো নর্স ভাষার শব্দ ‘সিস্টির’ থেকে, যার মূল উৎপত্তি প্রোটো-জার্মানিক শব্দ ‘সোয়েস্টার’ থেকে। ভাষা বা দেশ যা-ই হোক না কেন, বোনের প্রতি ভালোবাসার এই আবেগ সব সমাজেই এক ও অভিন্ন।
এই দিনটির তাৎপর্য কেবল উপহার দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত একটি সুযোগ, যখন আমরা আমাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিকে জানাতে পারি সে আমাদের কাছে কতটা আপন। বোনেরা আমাদের মানসিক প্রশান্তির জন্য এক ধরনের সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করে। হতাশা বা একাকিত্বের সময় তারা হয়ে ওঠে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। তাই এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ব্যস্ততার ভিড়ে যে মানুষটির কথা হয়তো আমরা অনেক সময় আলাদা করে ভেবে দেখি না, তাকে একটু সময় দেওয়া প্রয়োজন। মান-অভিমান ভুলে সম্পর্ককে আরও নিবিড় করার জন্য এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর কী হতে পারে!
বোনকে চমকে দিতে বা দিনটি উদ্যাপনের জন্য খুব বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। চাইলে তাকে নিয়ে ছোটবেলার কোনো পছন্দের খাবার খেতে যাওয়া যেতে পারে, অথবা দুজনে মিলে দেখতে পারেন পুরোনো দিনের কোনো প্রিয় সিনেমা। শৈশবের ছবির অ্যালবামের পাতা উল্টে পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করাও হতে পারে দারুণ একটি উপায়। দূরে থাকলে একটি আবেগময় ফোন কল, ছোট্ট একটি বার্তা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুজনের হাসিমুখের একটি ছবি শেয়ার করেও দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখা যায়। আর যদি কোনো কারণে দুজনের মধ্যে মান-অভিমান বা দূরত্ব তৈরি হয়ে থাকে, তবে সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে নতুন করে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর জন্য এই দিনটি হতে পারে একটি চমৎকার মাধ্যম।
জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে বোনের সমর্থন এক অমূল্য উপহার। ছোটবেলার সেই পুতুল খেলা থেকে শুরু করে জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্ত পর্যন্ত সবখানে তার উপস্থিতি এক অন্যরকম সাহস জোগায়। ছোটখাটো খুনসুটি বা রাগ-অভিমান এই সম্পর্কের সৌন্দর্যকে কেবল বাড়িয়েই দেয়। তাই দিনপঞ্জিকার পাতায় আগস্টের প্রথম রবিবারটি শুধু একটি সাধারণ দিন নয়, বরং এটি সেই মানুষটিকে ধন্যবাদ জানানোর দিন, যে কোনো শর্ত ছাড়াই আজীবন পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়।