তরুণদের চোখে জুলাই বিপ্লব এবং আগামীর প্রত্যাশা

নেটওয়ার্ক নিউজ বিডি ডেস্ক
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। বৈষম্যহীন নতুন রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্নে সেদিন অকাতরে প্রাণ বিলিয়েছিলেন দেশের অকুতোভয় ছাত্র-জনতা। বিজয়ের দুই বছর পর দাঁড়িয়ে বিপ্লবের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, শহীদদের স্মৃতি ও আগামীর প্রত্যাশা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনা তুলে ধরেছেন আমানুর রহমান।
মেধার লড়াই থেকে গণজাগরণ
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে মেধার ন্যায্য মূল্যায়নের যৌক্তিক দাবিতেই সূত্রপাত ঘটে কোটা সংস্কার আন্দোলনের। শুরুতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ আর ন্যায়ের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছিল। তাদের মূল প্রত্যাশা ছিল আলোচনার মাধ্যমে একটি যৌক্তিক সমাধান। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সংলাপের পথ রুদ্ধ করে দমন-পীড়ন, লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও নির্বিচার গ্রেপ্তারের পথ বেছে নেয়।
রাষ্ট্রীয় এই নির্মমতার মুখে শিক্ষার্থীদের দাবি আর শুধু কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা দ্রুতই সরকার পতনের ‘এক দফা’ দাবিতে রূপ নেয়। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব ছাড়াই ভয়হীন তরুণেরা রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নেয়। নেতৃত্বের শূন্যতাকে তারা নিজেদের ঐক্য ও ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তায় শক্তিতে পরিণত করে। নিজেদের সিদ্ধান্তে অদম্য সাহসের সঙ্গে মাঠ সামলে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই জুলাই আন্দোলনকে ঐতিহাসিক মাত্রায় উন্নীত করে।
– মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন, শিক্ষার্থী, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, কুষ্টিয়া
অদম্য সাহসের জুলাই
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র-জনতার অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য মহাকাব্য। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির আন্দোলন যেভাবে অতি দ্রুত সমগ্র জাতির লড়াইয়ে রূপ নেয়, এটি তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রিকশাচালক, শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও অভিভাবকসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ সেদিন রাজপথে নেমে শিক্ষার্থীদের পাশে অটল প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কেউ খাবার ও ওষুধ পৌঁছে দিয়েছেন, কেউ আহতদের চিকিৎসা করেছেন, কেউবা আবার নিশ্চিত করেছেন নিরাপদ আশ্রয়। এই অভূতপূর্ব সংহতি প্রমাণ করেছে, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও অধিকার রক্ষার সংগ্রামে বাংলাদেশ কখনো বিভক্ত নয়। ছাত্র-জনতার পারস্পরিক বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও আত্মত্যাগই এই আন্দোলনকে সর্বাত্মক গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক মেলবন্ধন কেবল বিজয়ের স্মারক নয়; বরং নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে স্বাধীনতার মূল্যবোধ চিরকাল জাগ্রত রাখার এক অমলিন প্রেরণা।
—আশিক বিন আলম সোহাগ, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম।
স্মৃতির পাতায় রক্তিম জুলাই
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে বৈষম্য ও ফ্যাসিবাদবিরোধী এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের নাম। সরাসরি অংশ নেওয়া ও স্বচক্ষে দেখা এই লড়াইয়ে তরুণদের আত্মত্যাগ কখনোই ভোলার নয়। ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে ফ্লাইওভারের নিচে সহযোদ্ধাদের রক্তাক্ত নিথর দেহগুলো বসন্তের ঝরা পাতার মতো স্তূপ হয়ে থাকতে দেখেছি। ভয়াবহ সেই অধ্যায়টি আমার কাছে এক ‘বিষাক্ত বসন্ত’, যা আজও আমাকে গভীর মানসিক যন্ত্রণায় তাড়া করে ফেরে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, এই গণঅভ্যুত্থানে ১৪০০-এর বেশি মানুষ শহিদ হয়েছেন। যাঁরা আহত হয়ে এখনো হাসপাতালের বিছানায় লড়ছেন, তাঁদের যন্ত্রণা অবর্ণনীয়। আমাদের দাবি, প্রশাসনকে অবিলম্বে শহিদ পরিবারগুলোর নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আহতদের সুচিকিৎসা এবং সরকারি চাকরি বা মুক্তিযোদ্ধা ভাতার মতো সম্মানজনক সুযোগের আওতায় আনতে হবে। এই বীরদের মহান আত্মত্যাগ দেশের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
— মো. মিজানুর রহমান, শিক্ষার্থী, সরকারি তোলারাম কলেজ, নারায়ণগঞ্জ।
শুভ্র/