কেবল ব্যবসা নয় প্রান্তিক নারীদের বেঁচে থাকার গল্প বুনছেন মুন্নী

নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুর। এখানকার পাহাড়, নদী আর সাধারণ মানুষের জীবনযাপনকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন কামরুন্নাহার মুন্নী। এই মানুষগুলোর জীবনসংগ্রাম আর বেঁচে থাকার আনন্দকে উপজীব্য করেই তিনি ২০০৯ সালে বুনেছিলেন এক রঙিন স্বপ্ন। তার সেই স্বপ্নের নাম ‘রঙ্গালয়’। আজ এটি শুধু একটি হস্তশিল্প বা লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড নয়, বরং মুন্নীর হাত ধরে এটি পরিণত হয়েছে শেকড় আর সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধনে।
কামরুন্নাহার মুন্নীর ভাবনায় রঙ্গালয় বা ‘রঙের ঘর’ কেবল সাজগোজ বা নান্দনিকতার কোনো জায়গা নয়। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি প্ল্যাটফর্ম গড়তে যেখানে রং কথা বলবে মানুষের আত্মপরিচয় আর শেকড়ের ভাষায়। মুন্নীর নির্দেশনায় তৈরি প্রতিটি পণ্যে তাই লুকিয়ে থাকে জীবনের নানা গল্প। প্রতিটি নকশায় ফুটে ওঠে সংস্কৃতির ছাপ, আর প্রতিটি রঙে মিশে থাকে কারিগরদের ঘাম আর দীর্ঘ এক ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি।

আজকাল যখন চারদিকে দ্রুত উৎপাদনের ছড়াছড়ি, সেখানে মুন্নী বিশ্বাস করেন ধীরস্থির সৃষ্টি বা স্লো ফ্যাশনে। তার তত্ত্বাবধানে প্রতিটি পোশাক, গয়না বা ঘর সাজানোর সামগ্রী তৈরি হয় অনেক যত্ন আর মমতায়। তার কাছে একটি পোশাক শুধু ব্যবসার পণ্য নয়, এটি একজন কারিগরের অনুভূতি বা একটি পরিবারের সংগ্রামের গল্প বলার মাধ্যম। সীমান্ত এলাকার মানুষের সংগ্রামী জীবনের আনন্দগুলোকে তিনি তুলে এনেছেন তার কাজের মধ্য দিয়ে। মুন্নীর কাছে লাল হলো বেঁচে থাকার শক্তি, সবুজ প্রকৃতি আর হলুদ হলো পূর্ণতার প্রতীক।
মুন্নীর চিন্তাধারার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন দেখা যায় রঙ্গালয়ের সিগনেচার মোটিফ ‘জংলা’তে। গারো পাহাড়ে ফুটে থাকা জংলাফুলের নাম থেকেই এই মোটিফের জন্ম। আমাদের সমাজে অনেক সময় পাহাড়ি বা বুনো মানুষদের অবহেলা করে জংলি বলা হয়। কামরুন্নাহার মুন্নী এই পরিচয়টিকে আক্ষেপের জায়গা থেকে তুলে এনে গর্বের প্রতীকে রূপ দিয়েছেন। তার মতে, সভ্যতার শুরু তো এই অরণ্য থেকেই। তাই জংলা মানে পিছিয়ে থাকা নয়, এটি হলো মানুষের ভেতরের শক্তি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর খাঁটি এক সম্ভাবনার নাম।

কামরুন্নাহার মুন্নীর এই যাত্রায় তিনি একা হাঁটেননি। যে উদ্যোগ তিনি শুরু করেছিলেন, আজ তার সঙ্গে যুক্ত আছেন ষাট জনের বেশি মানুষ। মুন্নী বিশেষভাবে কাজ করছেন প্রান্তিক মানুষ, আদিবাসী সম্প্রদায় এবং পিছিয়ে পড়া নারীদের নিয়ে। তার লক্ষ্য ছিল নারীদের মেধা আর সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থান তৈরি করা। এখানে কাউকে করুণা করা হয় না, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিটি কাজের মূল্যায়ন করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কেউ হাতে বোনা কাপড় জোগাড় করেন, কেউ নকশা আঁকেন, আবার কেউ সুঁই-সুতো দিয়ে সেই নকশায় প্রাণ দেন। এই সম্মিলিত শ্রমই মুন্নীর রঙ্গালয়ের মূল শক্তি।

আজকের বিশ্বায়নের যুগে যখন অনেকেই নিজেদের নিজস্বতা হারিয়ে ফেলছে, তখন কামরুন্নাহার মুন্নী তার ‘রঙ্গালয়’ দিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেন একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা। শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকাই হলো আসল আধুনিকতা। ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এই সাহসী যাত্রাই মুন্নী এবং তার রঙ্গালয়কে অন্যদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলেছে।